সদ্য সংবাদ :
বিনোদন

লেখক সাংবাদিক শাহীন চৌধুরীর নতুন উপন্যাস ‘নিরুদ্দেশ’ (পঞ্চম পর্ব)

Published : Thursday, 5 October, 2017 at 11:32 AM
পাঁচ: জানালা দিয়ে মনি দেখতে পায় ইনামদের আরও একটি টিনের ঘর রয়েছে কিন্তু সেখানে গরু রাখা হয়। সে ভাবে তাহলে কি ইনাম বাড়িতে আসলে রান্না ঘরেই থাকে? নাকি তাকে অপমান করার জন্যই এ আয়োজন? অবশ্য আলাদা কোন ঘরও নেই। কিন্তু বড় ঘরটির বারান্দায় একটি চৌকি পাতা আছে সম্ভবত ইনাম একা হলে সেখানেই থাকতো। ইতিমধ্যে তার গায়ের জ্বর বেড়ে গেছে। রান্না শেষ করে রূপাও তার ঘরে এসেছে। রূপার অপর দুই বোনও উঠে বাইরে গেছে। তখন মনির খাবার ডাক পড়ে। রূপাও তার সাথে খেতে বসে। মাটির মেঝেতে মাদুর বিছিয়ে খাবার ব্যবস্থা। ভাতের সাথে এবার দেয়া হয়েছে আলু ভর্তা, লাউ ঘন্ট ও ডাল। ক্ষুধায় মনির পেট জ্বলছে। তাই এবার ঝাল হলেও এক প্লেটের মত ভাত খায় সে। খাবার পর রূপাই প্রথম অনুভব করে মনির গায়ে জ্বর।
: ্একি? জ্বরেতো গা পুড়ে যাচ্ছে। কখন এমন হলো?
: সকালে অল্প ছিল এখন একটু বেড়েছে।
: একটু নয় অনেক।
বড় ঘরের চৌকিতেই তাকে কাথা গায়ে দিয়ে শুইয়ে দেয়া হয়। কিছুক্ষন পর রূপা কিসের যেন পাতা পাটায় পিষে মনির মাথার মাঝামাঝি লাগিয়ে দেয়। মনি জিজ্ঞেস করে এসব কি?
: তেলাকুচের পাতা। এতে আপনার জ্বর চলে যাবে।
মনি জীবনেও একথা শুনেনি। কোন জঙ্গলে এসেছে সে তা বুঝতে পারেনা। তারপরও সে যতœটাকে ভালো ভাবেই গ্রহণ করে। জ্বর যাক আর না যাক মাথাটা বেশ ঠান্ডা হয়ে গেছে সেজন্য তার কিছুটা ভালো লাগে। মনি বলে ভালোই তো দেখা যাক জ্বর যায় কিনা?
: ঠিকই যাবে আপনি ঘুমাবার চেষ্টা করুন। একথা বলে রূপা চলে যায়। সত্যি কিছুক্ষনের মধ্যে মনির চোখ বন্ধ হয়ে আসে।
মনি কতক্ষন ঘুমিয়েছে টের পায়নি। যখন জেগেছে তখন দেখে মাথার কাছে রূপা বসে একটি কাপড় ভিজিয়ে কপালে জলপট্টি দিচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে মনির চোখে জল এসে যায়। এত খারাপ মানুষের মধ্যে এমন ভালো মেয়েও আছে? চোখের জল দেখে রূপা জিজ্ঞেস করে ভাবি আপনি কাঁদছেন?
: নানা তোমার মত মেয়ে যেখানে আছে সেখানে কেন কাঁদবো?
: দেখুন আপনার এখন জ্বর নেই।
: হ্যাঁ তাইতো জ্বর নেই। তা তুমি কতক্ষন যাবৎ জলপট্টি দিচ্ছো?
: প্রায় এক ঘন্টা।
: কেন এত কষ্ট করছো আমার জন্য?
: করবনা, আপনি কি আমার পর?
: মোটেই না। তোমার মত ভালো বন্ধু খুব কম মানুষেরই ভাগ্যে জোটে।
এ সময় রূপা মনির মাথা থেকে তেলাকুচের পাতা ফেলে দেয়। বালিশটা চৌকির পাশের দিকে টেনে মাথার নীচে একটি পলিথিন দিয়ে মাথা ধুইয়ে দেয়। মনির সত্যিই খুব ভালো লাগে।
: এত কিছু কেন করছো? আমি নিজেই ধুয়ে নিতে পারতাম।
: কোন কথা বলবেন না এবার উঠে বসুন।
মনি উঠে বসে। ইতিমধ্যেই দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেছে। রূপা খাবার আয়োজন করতে করতে বলে আপনি ঘুমাচ্ছিলেন বলে ডাকিনি। সবার খাওয়া হয়ে গেছে। এবার আসুন শুরু করুন। মনি দেখতে পায় সকালের মেনুর সাথে ট্যাংরা মাছ যোগ হয়েছে। রূপা বলে ভাইয়া বাজার থেকে মাছ এনেছে।
: তা তোমার ভাইয়ার খবর কি?
: দুপুরে একবার এসে দেখে গেছে। বেচারা নতুন বউ নিয়ে আসলো তাও আবার জ্বর।
: কি আর করা যাবে সবই কপালের লিখন বলে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে মনি।
: মন খারাপ করবেন না। ভাইয়া এমনই। বাড়িতে আসলে সব সময় বাইরে বাইরে থাকে।
: ঠিক আছে তাতে আমার কোনও অসুবিধা নেই।
কথা বলতে বলতে খাওয়া শেষ হয়ে যায়। এরপর রূপা মনিকে নিয়ে বারান্দায় হেলা বেঞ্চিতে বসে। বাইরে তাকিয়ে থেকে উদাস হয়ে যায় মনি। ভাবে মানুষের জীবন এমন কেন? কাল কোথায় ছিলাম আজ কোথায় আর আগামীকাল কোথায় যাব তাও জানিনা। মনির মনের দুঃখ রূপা বুঝতে পারে। তাকে যে মনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এ বিয়ে করতে হয়েছে তাও বুঝতে বাকি থাকে না। কারণ শহরের মেয়ে এত অল্প বয়সে বিয়ে করার কথা নয়। তবে কি ভাইয়া কোন অঘটন ঘটিয়েছে? নাকি জোর করে তুলে নিয়ে এসেছে? একবার ভাবে মনিকে জিজ্ঞেস করবে কিন্তু আবার নিজেকে সংযত করে। কারন কোনও খারাপ খবর সে শুনতে চায়না। কৌশলে বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করে।
: ভাবি কোন কথা বলছেন না যে?
: এমনিতেই তুমি বল?
: আপনার বাবা মা কবে আসবে?
: আগামীকাল আসার কথা রয়েছে।
: তাহলে কালই আপনি চলে যাবেন?
: হয়তো তাই।
: আবার কবে আসবেন?
: তাও জানি না। আমারতো ক্লাশ আছে। তবে তোমার কারণেই আসবো।
: থ্যাঙ্কইউ ভাবি।
ইতিমধ্যেই সন্ধ্যে হয়ে গেছে। পাড়ার ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা উঁকি মেরে নতুর বউ দেখছে। এ নিয়ে মনির কোনও ভ্রুক্ষেপ নেই। এরই মধ্যে ইনামের মা এসে রূপার উদ্দেশ্যে বলে একদিনেই দেখি ননদ ভাবি পীড়িত হয়ে গেছে। এবার ঘরে আসো কুপি বাতি জ্বালাও।
: ঠিক আছে আসছি বলে ভেতরে চলে যায় রূপা। বড় ঘরে কুপি জ্বালায়। রূপার মা গোয়াল ঘরে ধুপ দেয়। উঠানের এক পাশে কয়েকটি গরু বাধা আছে। খড় দিয়ে আগুন জ্বালিয়ে সেগুলোকে ধোয়া দেয় মশা তাড়াবার জন্য। একটু পড়ে রূপা আবার এসে মনির সঙ্গে গল্পে মশগুল হয়ে যায়। রাত আটটার দিকে ইনাম খাবার জন্য আসার সময় বারান্দায় মনিকে দেখে জিজ্ঞেস করে কি খবর তোমার?
: এইতো ভালো।
: জ্বর গেছে?
: এখন নেই।
: থ্যাঙ্কইউ বলে ঘরে চলে যায়। ভাত খেয়ে কিছুক্ষন পর আবার বেরিয়ে যায়। মনি রূপাকে জিজ্ঞেস করে কোথায় যায় তোমার ভাইয়া?
: সামনে একটা বাজার আছে। ওই বাজারে চায়ের দোকানে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দেয়।
: ও তাই? সারাক্ষনই সেখানে থাকে?
: নানা আশেপাশেই বন্ধুদের বাসা। কারো বাসায় গিয়েও আড্ডা দেয়। অনেকদিন পরে বাড়িতে আসেতো তাই।
: বুঝতে পেরেছি।
এরই মধ্যে মনিদের খাবার ডাক পড়ে। খাওয়া শেষ হলে রূপার মা রূপাকে বিছানা করে মনিকে নিয়ে এক চৌকিতে থাকতে বলেন। তিনি একা একাই বলতে থাকেন জ্বরওয়ালা বউ-এর আর রান্না ঘরে থাকার প্রয়োজন নেই। আমি ইনামকে বলে দিয়েছি। অন্য চৌকিতে আমি ছোট দুইজনকে নিয়ে থাকবো। রূপার মায়ের এই সিদ্ধান্তে এই প্রথম তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় বুক ভরে যায় মনির। আজকের রাত নিয়েই তার ভেতরে ভয় কাজ করছিল। কারন গত রাতের সেই ব্যাথা তার এখনো রয়েছে। মনি রূপাকে জিজ্ঞেস করে তা তোমার ভাইয়া কোথায় থাকবে?
: মধ্য রাতে এসে বারান্দায় বিছানা করে শুয়ে পড়বে।
রূপার কথা শুনে মনি অবাক এবং বিস্মিত হয়। একটা মানুষের জীবন এ ধরণের হয় সেটা  সে ভাবতেই পারে না। সে বুঝতে পারে ইনাম গ্রামের একজন বাউন্ডলে ছেলে। ঘটনাক্রমে পুলিশ বিভাগে তার চাকরি হয়েছে কিন্তু ওই বিভাগের শৃঙ্খলার সঙ্গে সে এখনো একাত্ম হতে পারেনি। এ ধরণের ছেলের সঙ্গে সে আদৌ সংসার করতে পারবে কিনা তা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়ে।
পরদিন সকালে মনি দেখতে পায় একটি মাইক্রোবাস নিয়ে মনির বাবা, ভগ্নিপতি এবং প্রতিবেশী এক চাচা এসে উপস্থিত হয়েছেন। তারা একগাদা মিষ্টি ও ইলিশ মাছ নিয়ে এসেছেন। মনির আনন্দ আর যেন ধরে না। মনিকে দেখে বাবা জিজ্ঞেস করে কেমন আছিস মা?
: ভালোই আছি। তোমরা কেমন আছো?
: এই আছি আর কি।
: এত তাড়াতাড়ি এলে কিভাবে?
: গতকাল সন্ধ্যায় রওনা দিয়েছি।
: তাই! এত আগে?
: কি করবো বল। আমার মাকে বাইরে রেখে আমার কি ঘুম হয়?
: সেটা আমি জানি বাবা।
ইতিমধ্যেই ইনামের মা বোনদের সাথে অতিথিদের আলাপ পরিচয় হয়। ইনামের মা তাদেরকে শরবত ও মিষ্টি দিয়ে আপ্যায়িত করেন। ওদিকে রূপা মনিকে নিয়ে গোসল করতে যায়। বাড়ির পাশেই পুকুর সেখনে নেমে গোসল করতে হবে। এই অভিজ্ঞতাও নেই মনির কিন্তু কি করবে কোনও উপায় নেই। একটি দৃশ্য দেখে মনি সবচেয়ে বেশী অবাক হয় আর তা হচ্ছে অনেক মহিলাই সেখানে গোসল করছে আর পুকুরের পাড়ে উঠেই তারা ভেজা কাপড় পরিবর্তন করছে। মনির পক্ষে এভাবে কাপড় বদলানো সম্ভব নয়। সে রূপাকে নিয়ে ভেজা কাপড় পড়েই বাড়িতে চলে যায়। সেখানে গিয়ে রান্না ঘরের দরজা বন্ধ করে পোষাক পরিবর্তন করে। দুদিন পর গোসল করে তার বেশ ভালো লাগে। বাড়িতে অতিথি এসেছে বলে আজ ইনামের মা পোলাও রান্না করেছে। যদিও সেটা মোটা চালের তারপরও মনি আজ পেট ভরে খায়। সব মিলিয়ে তার মন আজ অনেকটাই ভালো।
সবার খাওয়া দাওয়া নানা আলোচনা করতে করতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যায়। এবার মনির বাবা যাবার আয়োজন করতে বলে। রূপা মনির সবকিছু গোছগাছ করে দেয়। মনির বাবা ইনামকে রেডি হতে বলে কিন্তু সে জানায় তার আরও তিনদিন ছুটি আছে সেটা শেষ করে আসবে। শুনে মনির বারা বিস্মিত হয়। নতুন বউয়ের সাথে জামাই শ্বশুড় বড়ি যাবে না তা সে ভাবতেও পারে না।
: আমিতো তিনদিন পরেই আসছি। তখন আমি আপনাদের বাসায় বেড়াবো।
: সেটা কি কোনও কথা বল?
: আমিতো সব সময় ছুটি পাই না তাই এ ছুটিটা কাজে লাগাতে চাইছি।
অগত্যা মনির বাবা তা মেনে নেন এবং মনিকে নিয়ে তারা তিনজন বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেন। পথে বাবা মনির সাথে কথা বলে নানা কিছু বের করার চেষ্টা করে।
: ওরা কি কোন খারাপ ব্যবহার করেছে মা?
: না।
মনির এক কথায় জবাব বাবার বিশ্বাস হয়না। আবার জানতে চায় খাওয়া দাওয়া করেছো ঠিকমত?
: হ্যাঁ করেছি।
: বাড়ির পরিবেশ কেমন?
: তোমরাতো নিজের চোখেই দেখলে।
বাবা বুঝতে পারে মেয়ের জীবনটা তারা শেষ করে দিয়েছে। এখন ভালোয় ভালোয় ওর পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারলেই হয়। যাইহোক দিনের অর্ধেক এবং সারা রাত শেষ করে ভোরবেলা নাগাদ তারা বাসায় এসে পৌছে। বাড়ির গেটের সামনে গাড়ির আওয়াজ দেখে মনির মা ও ছোট বোনরা দ্রুত এগিয়ে আসে। গাড়ি থেকে নামার পর মনির মা মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ে।
: কি হয়েছে? কাঁদছো কেন মা?
: তোমার কোন কষ্ট হয়নিতো মা?
: হলে হয়েছে, তাই বলে কি কাঁদতে হবে?
: তা জামাই আসেনি?
: না।
: কেন?
: আব্বুকে জিজ্ঞেস কর।
মনির মা বুঝতে পারে তার মেয়ে খুশী নয়। মেয়ের জীবনটা নষ্ট করে দেয়ার জন্য একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে সে। (চলবে)। 

এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম // এম.আর //




সম্পাদক : শাহীন চৌধুরী
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : হেলেনা বিলকিস চৌধুরী, নির্বাহী সম্পাদক : সৈয়দ আফজাল বাকের
ঢাকা অফিস: ২/১ হুমায়ুন রোড (কলেজ গেট) মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭ ফোন: ৮৮-০২-৯১১৯১১৬, ৯১৩৯২৭৪ হটলাইন: ০১৭১১-৫৮৩৬২৩, ০১৭১৮-৬৬৯৫৯৬, চট্টগ্রাম অফিস: নাসিমন ভবন ( দ্বিতীয় তলা) ১২১, নূর আহমেদ রোড, চট্টগ্রাম ফোন: ০৩১-২৫৫৭৫৪২ হটলাইন- ০১৭১১-৩০৭১৭১, E-mail : abnews13@gmail.com, Web : www.abnews24bd.com, Developed by i2soft Technology Ltd.
Close