সদ্য সংবাদ :
সাহিত্য ও সংস্কৃতি

লেখক সাংবাদিক শাহীন চৌধুরীর নতুন উপন্যাস ‘নিরুদ্দেশ’ ত্রয়োদশ পর্ব

Published : Monday, 8 January, 2018 at 1:32 PM
তের: মনি পল্লবদের বাড়িতে যাবার জন্য বহু চাপাচাপি করলে সে তাকে তাকে নিয়ে যেতে রাজি হয়। কিন্তু শর্ত দেয় মনিকে সে নিজেদের বাড়িতে নেবে না বোনের বাসায় নিয়ে রাখবে বান্ধবী পরিচয়ে। এর কারন হিসেবে সে বলে যেহেতু তাদের বাড়ির কেউই জানেনা যে পল্লব বিয়ে করেছে তাই এ ব্যবস্থা। মনি তাতেই রাজি হয়। তার রাজি হওয়ার কারন দুটি একটি হচ্ছে মনি সম্পর্কে পল্লবদের পরিবারের ধারনা কি বুঝে নেয়া এবং দূর থেকে পল্লবদের বাড়িটিও দেখে আসা। একই সাথে তাদের পরিবারের স্ট্যান্ডার্ড সম্পর্কেও অবহিত হওয়া। 
রংপুর শহরে পল্লবদের বাড়ি। কথামত দুজন বাসে উঠে রংপুর চলে যায়। শহরের কারমাইকেল কলেজ রোডে পল্লবের বোনের বাসা। সেখানে গিয়ে তারা ওঠে। পল্লবের বোনের স্বামী বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা আর বোন গৃহিনী। পল্লব বাসায় তার বোনকে বলে আপা ওর নাম মনি সে একজন আইনজীবী। আমার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে। আমরা বিয়ে করতে চাই এজন্যই আগে তোমকে দেখাতে নিয়ে এসেছি।
মনি আপাকে সালাম দেয়। 
: ওআলাইকুম আসসালাম। তা তোমাদের বাড়ি কোথায়?
: ঢাকার কাছেই নারায়নগঞ্জ।
: বাবা মা জীবিত আছে?
: হ্যাঁ জীবিত আছে। 
: কয় ভাই বোন তোমরা?
: আমরা তিন বোন আর এক ভাই। 
: তুমি কয় নম্বর?
: আমি দ্বিতীয়। 
এ সময় পল্লব বলে আপা এতসব কি জেরা করছো। ও তো কয়েকদিন তোমার বাসায় থাকবে তাই সব জানতে পারবে। আপা বলেন- ঠিক আছে তোমরা বস আমি তোমাদের খাবার ব্যবস্থা করি। আপার দুটি সন্তান রয়েছে। বড়টি মেয়ে নাম সোমা। সে অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। আর ছোট ছেলেটি একেবারেই পিচ্চি। 
ওরা ফ্রেশ হতে হতে খাবার জন্য ডাক পাড়ে। খাওয়া দাওয়া শেষে পল্লব মনিকে বোনের বাসায় রেখে নিজের বাড়িতে চলে যায়। রাতের বেলা মনির থাকার ব্যবস্থা হয় সোমার সাথে। মনি চালাকি করে ভাগ্নির সাথে বেশ ভাব জমিয়ে নেয়। প্রথম রাতেই সে জানতে পারে পল্লব তিন বছর আগে আরেকটি বিয়ে করেছিল। এক বছরের মাথায় তাদের মধ্যে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। এখন ওই মেয়েটি রাজশাহী মেডিকেল কলেজে পড়ছে। মামার সাথে তার যোগাযোগও আছে। ডাক্তারি পাশ করলে আবার তারা বিয়ে করবে। খবরটি শুনে মনির কান গরম হয়ে যায়। মনি আরও কিছু জানার চেষ্ট্ াকরে কিন্তু সোমা এর চেয়ে বেশী কিছু জানে না। শুধু ওই মেয়েটির নাম রেশমা বলে জানায় সে। সোমা তাকে শর্ত দেয় কথাগুলো যে আমি বলেছি তা কিন্তু বলবেন না আন্টি। 
: নানা কখনও বলবো না। তুমি খুবই লক্ষ্মী মেয়ে। এখন ঘুমিয়ে থাকো।
: আপনি ঘুমাবেন না?  
: হ্যাঁ আমিও ঘুমাবো। 
মনি অনেক চেষ্টা করে কিন্তু কার্যত তার আর ঘুম আসে না। একবার সে ভাবে বিষয়টি এখনই সে পল্লবের কাছে জানতে চাইবে আবার সিদ্ধান্ত নেয় সব আলোচনা হবে ঢাকায় গিয়ে। এখানে সিনক্রিয়েট করা ঠিক হবে না।
পরদিন এক বেলা এসে ঢু মেরে যায় পল্লব কিন্তু সারা দিনই লাপাত্তা। আপার সাথে গল্প করে দিন কাটায় মনি। বিকেলে সোমাকে নিয়ে রিকসা করে পল্লবদের বাড়ির সামনে দিয়ে ঘুরে আসে। এখানে এসে মনির অনেক কাজ হয়েছে। মনি যে পল্লবের দ্বিতীয় স্ত্রী সেটা সে জানতে পেরেছে পাশাপাশি তাকে নিয়ে এই লুকোচুরির কারনও আবিস্কার করেছে। সে তার আগের বউকে ফিরিয়ে আনবে নাকি মনিকে ঘরে তুলবে সেটা নিয়ে দ্বিধাদ্বন্দে রয়েছে। এই কাহিনী শুনে মনির নিজের প্রতি নিজেরই ঘৃণা ধরে যায়। পল্লবকে নিয়ে সংসার করার ব্যাপারেও সে হতাশ হয়ে পড়ে। যেসব পুরুষকে সে বিশ্বাস করে তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই রয়েছে গলদ। এবার বুঝতে পারে শামীমের উপর রাগ করে এত দ্রুত বিয়ে করা উচিৎ হয়নি। শামীম হয়তো একদিন তাকে গ্রহণ করতো কিন্তু এখনতো আর কোন পথই খোলা থাকলো না। ভবিষ্যতে আর সে শামীমকেও বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে পারবে না। এজন্য সে নিজের কপালকেই দুষতে থাকে।  
একদিন পর তারা ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হয়। সারা পথ মনির মুডঅফ দেখে পল্লব বুঝতে পারে কিছু একটা হয়েছে কিন্তু ইচ্ছে করেই রাস্তায় বিষয়টি তুলতে চায় না। ঢাকায় ফিরে একদিন পর মনি পল্লবের কাছে জানতে চায় তুমি কি আগে একটা বিয়ে করেছিলে?
: কে বললো?
: সেটা আমি বলবো না। ঘটনা সত্য নাকি মিথ্যে সেটা বল?
: সত্য তবে তা ছিল খুবই সাময়িক। আমি ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ করে সবে চাকরিতে ঢুকেছি আর ও তখন মাত্র একাদশ শ্রেণীর ছাত্রী সেজন্যই আমাদের পরিবার বিয়েটি মেনে নেয়নি। 
: খুব সুন্দর গল্প। এখন তো সে আবার যোগ্য হয়ে উঠছে তাই না? সহসাই ডাক্তার হয়ে বের হবে। এজন্যই আমাকে ঘরে নিতে আপত্তি।
: তোমার যা ইচ্ছে বলতে পার।
: তুমি আগে বিয়ে করেছিলে এটাতো আমাকে বিয়ের আগে কখনো বলনি। 
: তুমিও তো আগে বিয়ে করেছিলে। 
: সেটাতো আমি লুকাইনি। 
: যেহেতু তোমার সন্তান আছে। দীর্ঘদিন সংসার করেছে তাই লুকাতে পারনি। 
: খুব ভালো যুক্তি। মিথ্যুক চিট কোথাকার। 
: ডোন্ট সাউট। তুমিও মিথ্যুক। তুমিও চিট। 
: কিভাবে?
: আমাকে বিয়ে করে আরেকজনের সাথে সম্পর্ক রাখ এটা কি চিটিং নয়? 
: কারো সাথে আমার সম্পর্ক নেই।
: আমি তো প্রমান দিয়েছি। আর কি চাও? 
: শুধু এসএমএস-এই প্রমান হয়ে গেল? 
: অপেক্ষা কর আরও প্রমান দেব। 
: ঠিক আছে অপেক্ষায় থাকলাম।
মূলত রংপুর ট্যুরের পর থেকেই মনি আর পল্লবের মধ্যে তিক্ততা আরও বেড়ে যায়। পল্লব হন্যে হয়ে মনি বিরুদ্ধে আরও প্রমান খুঁজতে থাকে। সে মনে করে তার সাবেক স্বামীকে পেলেই মনির বিরুদ্ধে অনেক কিছু পেয়ে যাবে কিন্তু ফোন নম্বর যোগাড় করতে পারে না। একদিন মনির ফোনে ব্যালেন্স ছিল না তাই সে পল্লবের ফোন দিয়ে তার মেয়ের সাথে কথা বলে। যে নম্বরে সে কথা বলে সেটা ইনামের বর্তমান স্ত্রীর নম্বর। পরের দিন পল্লব অফিস টাইমে ওই নম্বরে ফোন করে ইনামের ফোন নম্বরটি নিয়ে নেয়। এভাবেই ইনামের সাথে পল্লবের যোগাযোগ হয়ে যায়। 
ইনাম যেহেতু দ্বিতীয়বার মনিকে বিয়ে করতে পারেনি সে কারণে তার ভেতরে প্রতিহিংসা জিঘাংসায় রূপ নিয়েছে। সে মনি সম্পর্কে পল্লবকে যারপর নেই খারাপ কথা বলে। মনি ব্যারিস্টার শামীমের কেপ্ট। শামীম তাকে নিয়ে দেশে বিদেশে ঘুরে বেরিয়েছে। একবার তারা বাচ্চাও নষ্ট করেছে। এমনকি এখনো তাদের মধ্যে দৈহিক সম্পর্ক রয়েছে ইত্যাদি। ইনাম তাকে এও বলে যে তার কাছে বিদেশ সফরকালে শামীম আর মনির ক্লোজ ছবিও রয়েছে। পল্লব তাকে ছবিগুলো ডাকে পাঠাতে বলে।        
ইনাম আনন্দে আত্মহারা হয়ে পরের দিনই ছবিগুলো ডাকে পাঠিয়ে দেয়। মনি আর শামীম নেপাল ট্যুরের সময় পাশাপাশি দাড়িয়ে দু’একটি ছবি তুলেছিল। ওই ছবিই কে বা কারা মনির ল্যাপটপ থেকে কপি করে নেয়। এক পর্যায়ে ইনাম তা সংগ্রহ করে। ওই ছবি নিয়ে ইতিপূর্বে ইনামের সাথেও মনির তর্ক হয়েছে কিন্তু মনি তাতে কোনও পাত্তা দেয়নি। আজ সেটিই আবার ব্যবহার করার সুযোগ নিচ্ছে ইনাম। 
একদিন পরই ছবিগুলো পেয়ে যায় পল্লব। কিন্তু ছবি পেয়েই প্রথম দিন তা প্রকাশ করে না। বরং ওইদিন মনির সাথে সে খুবই ভালো ব্যবহার করে। নজিরবিহীন ভাবে সেই রাতে সে দুইবার মনির সাথে সেক্স করে যা বিয়ের পর সে কোন দিনই করেনি। মনি ভাবে হয়তো পল্লব তার ভুল বুঝতে পেরে সুপথে আসছে। অবশ্য পরদিন সকালেই ঘটে অন্যরকম ঘটনা। সকালের নাশতা শেষ করে পল্লব ছবিগুলো মনিকে দেখায়। মনি বলে এগুলো পুরোনো কাসুন্দি। এই ছবি দিয়ে ইনামও তাকে ব্ল্যাকমেইল করতে চেয়েছে। 
: তা এ ছবি নিয়ে তোমার ব্যাখ্যা কি?
: এটা আমাদের ল’ফার্মের একটা অফিসিয়াল ট্যুর ছিল যেখানে আমরা সবাই গিয়েছিলাম। এই ট্যুরে আরও নারী সদস্য ছিলেন।
: তাদের ছবি কোথায়?
: ওই ছবিগুলো বাদ দিয়ে এভাবে ছবিটি তৈরী করেছে ইনাম। এটা তার মুন্সীয়ানা। সুপার ইম্পোজও বলতে পার। 
: তোমার এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। 
: তাহলে তুমি কি করতে চাও?
: এ ধরনের মহিলার সঙ্গে সংসার করা যায় না যে স্বামীকে কিনা বাদ দিয়ে অন্য পুরুষের সাথে সম্পর্ক রাখে। 
: বুঝতে পেরেছি তুমি তোমার ডাক্তারকে আবার ঘরে আনবে। নিজের লাম্পট্য ঢাকার জন্য আমার উপর দোষ চাপাচ্ছো।  
: তোমার যা ইচ্ছে বলতে পার কিন্তু আমার এটাই শেষ কথা আমি আর তোমার সাথে সংসার করবো না। 
মনি পল্লবের এই সিদ্ধান্তে স্তম্ভিত হয়ে যায়। সে যে একটা ঠান্ডা মাথার কিলার তা বুঝতে আর মনির কোনই অসুবিধা হয়না। আগের দিনই তাকে ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে গত রাতে সে মনিকে শেষ বারের মত ভোগ করেছে। গত রাতের ভালোবাসা ছিল পুরোটাই অভিনয় তা বুঝে ফেলে মনি। বিষয়টি নিয়ে আর কথা বলতেও তার ইচ্ছে হয় না তার। পল্লব অফিসে যাবার পথে কাজী অফিসে তালাকের নোটিশ জমা দিয়ে যায়। আর মনি তিন মাসের বিবাহিত জীবনের ইতি টেনে ওইদিনই নিজেদের বাড়ি চলে যায়। 
মনির বাবা বিষয়টি একেবারেই জানতেন না। তাকে বলা হয়েছে যাতায়াতের অসুবিধার কারনে বান্ধবীর বাসায় সাবলেট থেকে অফিস করছে মনি। মা কিছুটা আন্দাজ করেছে কিন্তু মনি তাকে প্রকাশ করতে নিষেধ করেছে। এবার মনি বাড়ি আসার পর আর অফিসে না যাওয়ায় তা বাবার দৃষ্টিতে পড়ে। এক পর্যায়ে পুরো পরিবারই বিষয়টি জেনে যান। বাবার ধারনা ছিল মনি এখন আইনজীবী সুতরাং সে এখন পরিপক্ক হয়েছে কিন্তু এই ঘটনায় বুঝতে পারে মনি এখনও শিশুই রয়ে গেছে। আর আদরের মেয়ের এই দুঃখ দেখে বাবা একেবারে ভেঙে পড়েন। 
পরিবারের সবাই নারী নির্যাতন মামলা করে পল্লবের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা নিতে বললেও তাতে কোনই কান দেয়না মনি। অপরাধীকে মাফ করে দেয়ার মধ্যেও সে যেন মহত্ত খুঁজে বেড়ায় (চলবে)। 
                                    


এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এলএল// 






সম্পাদক : শাহীন চৌধুরী
ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক : হেলেনা বিলকিস চৌধুরী, নির্বাহী সম্পাদক : সৈয়দ আফজাল বাকের
ঢাকা অফিস: ২/১ হুমায়ুন রোড (কলেজ গেট) মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭ ফোন: ৮৮-০২-৯১১৯১১৬, ৯১৩৯২৭৪ হটলাইন: ০১৭১১-৫৮৩৬২৩, ০১৭১৮-৬৬৯৫৯৬, চট্টগ্রাম অফিস: নাসিমন ভবন ( দ্বিতীয় তলা) ১২১, নূর আহমেদ রোড, চট্টগ্রাম ফোন: ০৩১-২৫৫৭৫৪২ হটলাইন- ০১৭১১-৩০৭১৭১, E-mail : abnews13@gmail.com, Web : www.abnews24bd.com, Developed by i2soft Technology Ltd.
Close