সদ্য সংবাদ :
জাতীয়

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ

Published : Saturday, 9 October, 2021 at 11:13 PM
স্টাফ রিপোর্টার: “পঞ্চাশে বাংলাদেশ: অনিশ্চিত যাত্রা থেকে উন্নয়নের রোল মডেল” শিরোনামে অনলাইনে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসীদের দুদিনব্যাপী আয়োজনে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, বাংলাদেশের উন্নয়ন অন্যদের অনুসরণীয়। তবে আগামীতে বিশ বছরের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য নানা চ্যালেঞ্জ বিশেষ করে প্রাথমিক জ্বালানি জোগান, মানসম্মত শিক্ষা, লো-কার্বন শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন ইত্যাদি মোকাবেলায় সঠিক নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।  
 
বাংলাদেশ ২০২১ সালের ডিসেম্বরে স্বাধীনতার ৫০ বছর সাড়ম্বরে পালন করবে। উদ্‌যাপিত হবে সুবর্ণ জয়ন্তী। দেশের মতো প্রবাসী বাঙালিরাও এ উৎসবে অংশ নেবে। প্রবাসীদের মধ্যে বাংলাদেশের ৫০ বছরের অর্জন এবং আগামীতে করণীয় সম্পর্কে জানাতে সবার আগে এগিয়ে এসেছে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাঙালিরা। অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক সংগঠন ‘আমরা ক’জন-দি লিগ্যাসি অফ বঙ্গবন্ধু অস্ট্রেলিয়া ইনক “পঞ্চাশে বাংলাদেশ: অনিশ্চিত যাত্রা থেকে উন্নয়নের রোল মডেল” শীর্ষক দু’দিনব্যাপী এক সেমিনারের আয়োজন করে। ৭ এবং ৮ অক্টোবর অস্ট্রেলিয়ার ব্রিসবেনে এই আন্তর্জাতিক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়।

বিদেশের মাটিতে এ ধরনের সেমিনার বাংলাদেশকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যথাযথভাবে তুলে ধরবে। এক সময়ের নেতিবাচক ইমেজ থেকে ইতিবাচক ইমেজ তৈরিতে সহায়তা করবে। বাংলাদেশের ব্র্যান্ডিংয়ের জন্যও এমন সেমিনার জোরালো ভূমিকা রাখবে। 

আট বিষয়ের উপর বাংলাদেশে খ্যাতিমান ৮ বিশেষজ্ঞ সামাজিক, রাজনৈতিক, কৃষি, শিক্ষা, জ্বালানি ও পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও পর্যটন, দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান, কোভিড ও বাংলাদেশের পোষাক শিল্প এবং বাংলাদেশের আন্তর্জাতিককরণ নিয়ে উপস্থাপনা করেন প্রফেসর রেহমান সোবহান, ড. শামসুল আলম, মুহম্মদ জাফর ইকাল, প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. তৌফিক ই এলাহী চৌধুরী, প্রফেসর ফরাস উদ্দিন, ফারুক হাসান ও প্রফেসর শুনসুকি মানাগি। এছাড়াও বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের যথাস্থাপন বিষয়ক একটি বিশেষ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ফ্রাঙ্ক রামসে ইমারিটাস প্রফেসর স্যার পার্থ দাশগুপ্ত। এছাড়াও অস্ট্রেলিয়া থেকে আলোচনায় অংশ নেন প্রফেসর ড. আলাউদ্দিন, প্রফেসর সামস আহমেদ, ড. তপন সাহা, লাইলাক শহীদসহ আরো অনেকে। জুম এর মাধ্যমে অনুষ্ঠিত দুদিনব্যাপী এই কর্মসূচি ফেসবুকে লাইভ সম্প্রচার করা হয়। 

আলোচনায় বাংলাদেশের ৫০ বছরের অর্জনকে বিশ্বে অনুসরণীয় উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরা হয়। বলা হয়, আগামী বিশ বছরের অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য নানা চ্যালেঞ্জ বিশেষ করে প্রাথমিক জ্বালানি জোগান, মানসম্মত শিক্ষা, লো-কার্বন শিল্পায়ন, কৃষির আধুনিকায়ন ইত্যাদি মোকাবেলায় সঠিক নীতি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই। নিজস্ব সম্পদ আহরণ ও ব্যবহারে গুরুত্ব দেওয়ার পাশাপাশি মানবসম্পদ উন্নয়ন ও রপ্তানি বহুমুখীকরণের উপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশকে মর্যাদার আসনে বসাতে পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সর্তক করে দেওয়া হয় পরিবেশসম্মত উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কৌশল নিতে ব্যর্থ হলে এবং তার জন্য দক্ষ জনবল সৃষ্টি করতে না পারলে উন্নত দেশে পৌঁছানোর কাজ বিলম্বিত হতে পারে।   

বঙ্গবন্ধু ও বাঙালি জাতিসত্ত্বা: নেতৃত্ব ও কৌশল
সেমিনারে সূচনা বক্তব্যে সিপিডির চেয়ারম্যান রেহমান সোবহান বলেন, উর্দু পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ঘোষণার পর বাঙালি তার আত্মপরিচয় খুঁজে নিতে উদ্বুদ্ধ হয়। বঙ্গবন্ধু এ প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এরই ধারাবাহিকতায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ৬৬ সালে ৬ দফা প্রণয়ন করে। ১৯৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সম্পূর্ণ মেজরিটি পায়। বাঙালি জাতি এর মাধ্যমে ৬ দফার প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়ে দেয়। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। এরপর সশস্ত্র মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে। 

কোনো পাকিস্তানি মেজরের বঙ্গবন্ধুর নামে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠ কোনো বিষয় নয়। কোনো জাতির দেশ বা রাষ্ট্র ঘোষণা দিয়ে শুরু হয় না। এটা একটি প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে হয়। হাজারটা দেশ আছে যেখানে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়া হয়নি। কারণ যে কেউ দাবি করতে পারে, এ ভূখণ্ড তার দেশ। তা বললেই তো হবে না। ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা থাকতে হবে, গ্রহণযোগ্যতা থাকতে হবে। স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে কোনো বিতর্ক আমি সিরিয়াসলি নেই না।

বাংলাদেশ-এর কৃষি স্বনির্ভরতা থেকে রপ্তানিমুখিতা
সেমিনারে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বলেন, বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক দর্শন ছিল, ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়তে হলে কৃষিকে প্রাধান্য দিতে হবে। বর্তমানে সে ভিশন বাস্তবায়নের কাজ চলছে। ফলে বাংলাদেশ তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উপচে পড়া ঝুড়ির দেশে পরিণত হয়েছে। মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে দ্বিতীয়। ধান উৎপাদনে আমরা তৃতীয়। ড্রাগন, স্ট্রবেরি, খেজুর, আপেলের মতো অপ্রচলিত ফলও এখন দেশে উৎপাদন হচ্ছে। বাণিজ্যিক কৃষিতে বাংলাদেশ অনেক এগিয়ে গেছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা ‘গোলা ধরা ধান, পুকুর ভরা মাছ’ পরিচয় আবার ফিরে পেয়েছে। বন্যা, খরা মোকাবেলা করে দেশ এখন উদ্বৃত্ত খাদ্যের দেশ। সবজি উৎপাদন হচ্ছে ব্যাপকভাবে। কৃষির উপর নির্ভরশীল শিল্প গড়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলা করতে কৃষিতে নতুন প্রযুক্তি ব্যবহার হচ্ছে। এখন সময় এসেছে কৃষিকে বহুমুখি এবং বৈচিত্রময় করার। সরকার কৃষিতে সবধরনের সহায়তা চালু রেখেছে।

বাংলাদেশ-এর শিক্ষা: ২০৪১ রূপকল্পের প্রেক্ষিত মানবসম্পদ বিনির্মাণ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মুহাম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, বিশ্বদ্যিালয়গুলো শিক্ষা দিচ্ছে কিন্তু কোনো গবেষণা করছে না। জ্ঞান তৈরিতে সহায়তা করছে না। ভোকেশনার শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। ভোকেশনাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আরও বাড়াতে হবে। ভোকেশনার পড়া শিক্ষার্থীদের সামাজিক মর্যাদা উচ্চ করার ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ আমাদের এখন প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা মুখস্ত করাকে অগ্রধিকার দেয়া হচ্ছে। নম্বর বা জিপিএ প্রাধান্য পাচ্ছে, জ্ঞান নয়। দেশের অর্থনীতি এখন তিন চাকায় চলছে। কৃষি, গার্মেন্ট এবং অদক্ষ মানবসম্পদ হলো এ তিন চাকা। চতুর্থ চাকা হতে পারে জ্ঞান।

তিনি আরও বলেন, কারণ সামনে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব আসছে। আমাদের এখন প্রয়োজন দক্ষ মানবসম্পদ। সেখানে প্রয়োজন হবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টিলিজেন্স, রোবোটিক্স, জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং ক্লাউড কম্পিউটিং। দক্ষ জনশক্তি না থাকলে আমরা এসব ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকব। আমাদের এখন যা করতে হবে তা হলো মেধা যেন বাইরে চলে না যায় তা দেখা। নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষা দিতে হবে। এছাড়া প্রযুক্তি কেনা নয়, প্রযুক্তি তৈরি করতে হবে।

বাংলাদেশ-এর স্বাস্থ্য সেবা: আত্মনির্ভরতা থেকে স্বাস্থ্য পর্যটন
সেমিনারে প্রফেসর ডা. মোহাম্মদ শহীদউল্লাহ বলেন, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল এবং এবং শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউট ভবিষতে মেডিকেল ট্যুরিজমের অন্যতম স্থাপনা হতে পারে। বাংলাদেশের মানুষ চিকিৎসা নিতে দেশের বাইরে যায় তা নয় এখন বাংলাদেশেও উন্নত দেশ থেকে অনেকেই চিকিৎসা নিতে আসেন। বিশেষ করে দাঁতের চিকিৎসা নিতে, চোখের ছানি অপসারণ করতে। আমরা এখন কার্ডিয়াক, বাইপাস সার্জারি এমনকি ট্রান্সপ্ল্যান্ট পর্যন্ত দেশেই করছি। ওষুধ শিল্পের অগ্রগতি অতুলনীয়। দেশের বেশ কয়েকটি কোম্পানি ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে ওষুধ রপ্তানি করছে।

তিনি আরও বলেন, ইপিআই প্রোগ্রামে ভ্যাকশিনেশনে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ান। এক্ষেত্রে আমাদের সাফল্য ঌ৯ ভাগ। কম্যুনিটি ক্লিনিক নতুন ধারণা হলেও বাংলাদেশে এর প্রভাব রয়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় কম্যুনিটি ক্লিনিকের ব্যাপক সাফল্য চোখে পড়ে। গত দেড় দশক ধরে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার প্রায় ২.৩। বলা যায়, একই অবস্থান ধরে রেখেছে।

বাংলাদেশের জ্বালানি উৎপাদন: উন্নয়ন ও পরিবেশ
সেমিনারে প্রধানমন্ত্রী’র জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও খনিজ সম্পদ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বীর বিক্রম বলেন, বাংলাদেশ প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার বিগত ১২ বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করেছে। প্রাথমিক জ্বালানি বিশেষ করে গ্যাস যোগানে সংকট থাকলে এলএনজি আমদানী করা হচ্ছে ঘাটতি মেটানোর জন্য। অনুসন্ধান কাজ অব্যাহত আছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন এখন ২৫ হাজার মেগাওয়টের বেশি। সঞ্চালন ও বিতরণে যে সংকট আছে তা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিনিয়োগ করা হচ্ছে। জ্বালানির দক্ষ ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির বিকাশ নিয়ে পরিকল্পিতভাবে সরকার কাজ করে যাচ্ছে।

জমি স্বল্পতার বিচেনায় নেটমিটারিং এর আওতায় শিল্পের ছাদে সোলার স্থাপনের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তাতে সাফল্য আসতে শুরু করেছে। কিন্তু আজকের বিশাল জ্বালানি খাত আরো দক্ষভাবে চালিয়ে নেওয়ার জন্য আমাদের প্রয়োজন দক্ষ জনশক্তি। দেশে যেমন দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে তেমনি দেশের বাইরে থাকা দক্ষ ও মেধাবি বাংলাদেশি ব্যক্তিদের কিভাবে কাজে লাগান যায় তার পরিকল্পনা করা দরকার। এজন্য সরকার উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া ধীরে ধীরে ফসিল ফুয়েল নির্ভরতা কাটিয়ে বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করা যায় তা নিয়েও কাজ হচ্ছে।

বিশেষ পর্ব: গোল টেবিল বৈঠক 
গোল টেবিল বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্রের কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ফ্রাঙ্ক রামসে ইমারিটাস প্রফেসর স্যার পার্থ দাশগুপ্ত বলেন, বাংলাদেশ তার অর্থনীতি নিয়ে উদ্্যাপন শুরু করে দিতে পারে। বাংলাদেশ উদ্্যাপন করার মতো আরও কিছু বিষয় করে ফেলেছে। দেশটি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রেণে বিশাল সাফল্য দেখিয়েছে। পরিবার পরিকল্পনা কর্মীরা বাড়ি বাড়ি যেয়ে বুঝিয়েছে। সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে কথা বলেছে। জন্ম নিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ঠিকমতো সরবরাহ করেছে। কম্যুনিটি ডিসকাশন করেছে। এভাবেই বাংলাদেশ জনসংখ্যা বৃদ্ধিও হার ২.৩ ধরে রেখেছে অনেকদিন। জনসংখ্যার ওপর সবকিছু নির্ভর করে না। তবুও দারিদ্য নিয়ন্ত্রণে জনসংখ্যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। আফ্রিকা শুধুমাত্র জনসংখ্যার জন্য গরিব।

বাংলাদেশ অনেক ক্ষেত্রে সাবসিডি দিচ্ছে। কিন্তু এটা প্রকৃতপক্ষে কাদের কাছে যাচ্ছে। ফসিল ফুয়েল, স্যানিটেশন বা নিরাপদ পানিতে যে সাবসিডি দেয়া হয় তার সিংহভাগ শহরের মানুষ পাচ্ছে। গ্রামীণ বিপুল জনগোষ্ঠী তা থেকে বঞ্চিত। কৃষক ফসলের দাম পাচ্ছে না। কিন্তু এ খাতে ব্যাপক সাবসিডি আছে। সরকার ব্যবস্থা না নিলে যাদের ক্ষমতা আছে তারা এমনিতেই নানা রকম সাবসিডি নিয়ে নেবে।

উন্নয়নের জন্য আমরা প্রাকৃতিক সম্পদের উপর চাপ দিচ্ছি। কোনোরকম টেকসই ব্যবস্থা ছাড়াই ফিজিকাল সম্পদ (রাস্তা, ইমারত, মেশিনারিজ) বাড়িয়ে চলেছি। জিডিপি বাড়াতে এ প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হচ্ছে। প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় যা করা হচ্ছে তা মোটেই গ্রহণযোগ্য মাত্রায় নয়। উন্নয়ন করতে গেলে প্রাকৃতিক সম্পদ বিনষ্ট হবে। তবে দুটোর মধ্যে ভারসাম্য রাখতে হবে। তাহলেই দুদিক রক্ষা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের কোলারাডো বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইস্ট প্রফেসর এডওয়ার্ড বারবিয়ার বলেন, বন্যা খরা মোকাবেলা করে গরিবতম দেশ থেকে বাংলাদেশ ইমার্জিং ইকোনমির দেশে পরিণত হয়েছে। অর্থনীতি বহুমুখি করেছে, শ্রমঘন শিল্প গড়ে তুলেছে। রপ্তানি চালু করতে পেরেছে। ২০০০ সাল থেকে ১৮ বছরে বেশকিছু ‘সাটেনেবল গোল’ অর্জন করে ফেলেছে। ২০ বছরে মাথাপিছু আয় দ্বিগুন হয়েছে।

বর্তমানে কোভিডের কারণে কিছুটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। এছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সাগরে পানির উচ্চতা বৃদ্ধিও আশঙ্কা, উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ এবং কৃষির ভারনারেবল অবস্থা, সুপেয় পানির সমস্যা, স্যানিটেশন এমন ধরনের চ্যালেঞ্চ বাংলাদেশের সামনে রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ গ্রিন ট্রান্সফর্মেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে বিশ্বে রোল মডেল হতে পারে। এর জন্য প্রয়োজন হবে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ এবং কৃষির ভারনারেবল অবস্থা দূর করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পিত সহায়তা ও পুনর্বাসন করা। কারণ বিশ্বের বৃহৎতম ম্যানগ্রোভ বন বাংলাদেশে, যা গ্রিন ইকোনমির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফসিল ফুয়েলে সাবসিডি নিয়ে ভাবতে হবে। প্রায় ২০০ বিলিয়ন ডলার এ খাতে সাবসিডি দেওয়া হয়। যাতে শহরের মানুষ লাভবান হয়। এ অর্থ দিয়ে সোলার সেফটি নেট করা যায়। সাবসিডি ক্লিন এনার্জিতে দিলে পরিবেশ এবং মানুষ উপকৃত হবে। পানি ব্যবস্থাপনা, স্যানিটেশনে যে সাবসিডি দেওয়া হয় তার অর্ধেকও যদি গ্রামীণ এলাকায় দেওয়া হয় তাহলে মানবসম্পদ (শিক্ষা, জ্ঞান) বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে।

বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের যথাস্থাপন: অর্জন, সুযোগ ও সম্ভাবনা
সেমিনারের শেষ দিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর প্রফেসর মোহাম্মদ ফরাস উদ্দিন বলেন,  বাংলাদেশের মানুষের আয় বেড়েছে। সেইসঙ্গে বেড়েছে ক্রয়ক্ষমতা। তবে সে তুলনায় ট্যাক্স দেওয়ার পরিমাণ বাড়েনি। মাত্র ১০ ভাগ মানুষ ট্যাক্স দেয়। রাষ্ট্রীয় পুঁজি বাড়াতে হলে ট্যাক্স আহরণ অবশ্যই বাড়াতে হবে। বর্তমানে মানি লন্ডারিং, দুর্নীতি, ড্রাগ বড় সমস্যা। এগুলো নিয়ে কাজ হচ্ছে। দুর্নীতি দমন বিভাগ শক্তভাবে মোকাবেলা করছে। তবে পুঁজিবাদি অর্থনীতিতে দুর্নীতি একবারে বন্ধ করা যাবে না। দেশে ১০০০ কোটিপতি থাকেলও বিনিয়োগ তেমন নেই। ব্যক্তি খাতে মাত্র ১১% বিনিয়োগ হয়। কোটিপতিরা বিনিয়োগ করতে চায় না। শেয়ার মার্কেট বড় করা যায়নি। বছরে ৫-৬ মিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যায়। আমাদের বিদেশি বিনিয়োগ আনতে হবে।

তিনি বলেন, পদ্মা ব্রিজ, বঙ্গবন্ধু কর্ণফুলি টানেল, মেট্রো রেল এ প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন প্রায় শেষ। প্রকল্প পরিপূর্ণভাবে চালু হলে ১% জিডিপি বাড়বে আর দারিদ্য কমবে ০.৮৫% হারে। এর ফলে বাংলাদেশের ইমেজ আরও অনেক বেড়ে যাবে। অগ্রগামী অর্থনীতির দেশ হিসেবে আমরা মর্যাদা পাব। বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশের যথাস্থাপন: অর্জন, সুযোগ ও সম্ভাবনা

৭৫ এ বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ পুঁজিবাদ নীতি গ্রহণ করে। বাজার অর্থনীতি চালু হয়। নানা রকম উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে। বর্তমানে প্রায় ১৫ মিলিয়ন চাকরি সৃষ্টি হযেছে। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, আইএমএফ সহ অনেক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের অর্থনীতি নিয়ে নানা উদ্যোগের প্রশংসা করছে। অমর্ত্য সেন, কৌশিক বসু সহ আরও অনেকে বাংলাদেশ নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। ইকোমমিস্ট, ব্লুমবার্গের মতো প্রভাবশালী পত্রিকাও এতে যোগ হয়েছে।

বাংলাদেশের পোষাক শিল্প: কোভিড পরবর্তী প্রতিযোগিতা সক্ষমতা
বিজিএমইএ সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ৪ মিলিয়ন শ্রমিক নিয়ে গার্মেন্ট খাত চলছে। এর মধ্যে ৬০% নারী। আরও ১০ মিলিয়ন মানুষ এখাতের সঙ্গে পরোক্ষভাবে জড়িত। রপ্তানির প্রায় ৮৩% আয় গার্মেন্ট খাত থেকে আসে। বাংলাদেশে পৃথিবীর সবচাইতে বেশি ১৪৮টি গ্রিন কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে ৪৪টি প্লাটিনাম, ৯১টি গোল্ড আর ৯টি সিলভার।

আমদের গার্মেন্ট মূলত কটন কেন্দ্রিক, প্রায় ৭৪%। কিন্তু নন-কটনের অনেক বড় বাজার রয়েছে। এলডিসি থেকে উত্তরণ হলে এ সেক্টর অসুবিধায় পড়ে যাবে। কারণ অনেক রকম ট্যাক্স সুবিধা আমরা আর পাব না। আশার কথা হলো আমরা চীনে গার্মেন্ট রপ্তানি শুরু করেছি। চীনে আমাদের সুযোগ আছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় অন্তর্ভুক্তিমূলক সম্পদ: বাংলাদেশ প্রেক্ষিত
জাপানের কিয়ুশু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুইস্ট প্রফেসর শুনসুকিমানাগি সেমিনারে বলেন, ইনক্লুসিভ সম্পদ ক্ষেত্রে ১৪০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪তম। বৃদ্ধির হার ৩.১%, যা অনেকের কাছেই ঈর্ষণীয়। বন্যা মোকাবেলায় বাংলাদেশ অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছে। আর্সেনিক সমস্যা কমিয়ে ফেলেছে। শিল্প ক্ষেত্রেও অগ্রগতি হয়েছে। ফিজিকাল সম্পদ (রাস্তা, ইমারত, মেশিনারিজ) বাড়ছে। জিডিপি বাড়ছে। তবে প্রাকৃতিক সম্পদ কমছে।

এখন মানবসম্পদ বৃদ্ধিতে মনযোগ দেয়া দরকার। শিক্ষায় সমতা আনতে যারা ঝরে পড়েছে তাদের ভোকেশনার শিক্ষায় ফিরিয়ে আনতে হবে। কারণ গ্রামীণ জীবনেও শিক্ষা জরুরি। ভোকেশনাল শিক্ষা মানবসম্পদ (শিক্ষা, জ্ঞান) বৃদ্ধিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশকে ভবিষৎ প্রজন্ম এভাবেই গড়ে তুলতে হবে।

কনফারেন্সের বিশেষ পর্বে এক গোলটেবিল বৈঠকে অংশ নিয়ে আলোচনা করেন কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ফ্রাঙ্ক রামসে ইমারিটাস প্রফেসর স্যার পার্থ দাশগুপ্ত, কোলারাডো বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর এডওয়ার্ড বারবিয়ার, সুইডেনের বেইয়ার ইনস্টিটিউট অফ ইকোলজিক্যাল ইকোনোমিক্স পরিচালক প্রফেসর কার্ল ফোক এবং জাপানের কিয়ুশু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিস্টিংগুইস্ট প্রফেসর প্রফেসর শুনসুকি মানাগী।

অনলাইনে অনুষ্ঠিত এই কনফারেন্সের আয়োজন করেছে অস্ট্রেলিয়ার কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি, আরএমআইটি ইউনিভার্সিটি, কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটি অফ টেকনোলজি, গ্রিফিথ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অফ সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, ম্যাকুয়ারি ইউনিভার্সিটি, সুগার রিসার্চ অস্ট্রেলিয়া, কুইন্সল্যান্ড হেলথের সিনিয়র শিক্ষক ও গবেষকরা এবং অস্ট্রেলিয়ার সামাজিক সংগঠন ‘আমরা ক’জন-দি লিগ্যাসি অফ বঙ্গবন্ধু অস্ট্রেলিয়া ইনক।

এবিনিউজ টোয়েন্টিফোর বিডিডটকম /এম.এস






জাতীয় পাতার আরও খবর


  • সম্পাদক: শাহীন চৌধুরী
    উপদেষ্টা সম্পাদক: হেলেনা বিলকিস চৌধুরী, নির্বাহী সম্পাদক: বরুণ ভৌমিক নয়ন, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: সৈয়দ আফজাল বাকের, ঢাকা অফিস: ২/১ হুমায়ুন রোড (কলেজ গেট) মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭ ফোন: ৮৮-০২-৪৮১১৯৪৯৫, হটলাইন: ০১৭১১-৫৮৩৬২৩, ০১৭১৭-০৯৮৪২৮, চট্টগ্রাম অফিস- আবাসিক সম্পাদক: জাহিদুল করিম কচি, নাসিমন ভবন (দ্বিতীয় তলা) ১২১, নূর আহমেদ রোড, চট্টগ্রাম ফোন: ০৩১-২৫৫৭৫৪২ হটলাইন: ০১৭১১-৩০৭১৭১, E-mail : [email protected], Web : www.abnews24bd.com, Developed by i2soft Technology Ltd.
    Close