বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্রমেই বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার চাপে পড়ছে। জ্বালানির দাম বদ্ধিৃ , দীর্ঘস্থায়ী ডলার সংকট এবং আমদানিনির্ভরতা উৎপাদন ব্যবস্থা, কৃষি, পরিবহন এবং সাধারণ মানষেুর জীবনযাত্রায় চাপ সৃষ্টি করছে। এই প্রেক্ষাপটে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—এটি কি সাময়িক ধাক্কা, নাকি অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি “এনার্জি ট্র্যাপ”-এ আটকে পড়ছে?এই প্রেক্ষিতে “আজকের এজেন্ডাঃ জ্বালানীর ফাঁদে বন্দি অর্থনীতি? / Is the Economy in the Energy Trap?” শীর্ষক পর্বটি জ্বালানি–অর্থনীতি সম্পর্কের পরিবর্তনশীল বাস্তবতা এবং এর প্রবদ্ধিৃ ও স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব বিশ্লেষণের চেষ্টা করে। আলোচনায় অংশ নেন বিশেষজ্ঞ, নীতি নির্ধারক এবং শিল্পখাতের প্রতিনিধিরা, যারা সমস্যার গভীরতা ও সম্ভাব্য সমাধানের পথ নিয়ে মতামত দেন।
পিপিআরসি’র ফ্ল্যাগশিপ ওয়েবিনার “Ajker Agenda: Is the Economy in the Energy Trap?”-এ সেক্টর বিশেষজ্ঞ, বেসরকারি খাত, এনজিও এবং গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা চলমান জ্বালানি সংকটের স্বল্পমেয়াদি ধাক্কা এবং মধ্যমেয়াদি কাঠামোগত ঝুঁকিগুলো তুলে ধরেন। আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লরু রহমান। প্যানেলে ছিলেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ. সত্তার মন্ডল , ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল (টিএসআই) এর চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমদুলু হক, পদ্মা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড এর চেয়ারম্যান এবং সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খান, বাংলাদেশ চেম্বার অফ ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এর চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ এবং বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি মোহাম্মদ নাজমলু হক। এছাড়াও ছিল সাংবাদিক সহ সমাজ উন্নয়নকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত যোগদান।
আলোচনায় উঠে আসে যে সরবরাহ সীমাবদ্ধতা, চাহিদা-নির্ভর প্রতিক্রিয়া এবং যোগাযোগ ঘাটতির সমন্বয়ে সংকটের তীব্রতা বদ্ধিৃ পেয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ের বিঘ্ন দ্রুতই আতঙ্কজনিত ক্রয় আচরণে রূপ নেয়, ফলে কয়েক দিনের মধ্যেই জ্বালানির চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়। রেশনিংয়ের মতো প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হলেও অনিশ্চয়তার কারণে সাধারণ ভোক্তা ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা জ্বালানি মজতু করতে শুরু করে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।
সাবেক জ্বালানি সচিব এ কে এম জাফর উল্লাহ খান সংকটের মলূ কারণ নির্দেশ করতে গিয়ে বলেন “আমাদের মজদু ক্ষমতা কি পরিমাণ আছে, কতোদিনের জন্যে আমরা মজতু রাখতে পারি এই প্রশ্নটা উঠছে। এনার্জির এই দাম ইন্টারন্যাশনাল মার্কেটের সাথে সমন্বয় করে আজ হোক কাল হোক বাড়াতেই হবে আর এই প্রক্রিয়া চলবেই। কিন্তু যতোই দাম বাড়ুক বা কমুক আমাদের দরকার নিরবিচ্ছিনভাবে সরবরাহ করা। আমাদের স্টোরেজ ক্যাপাসিটি ওভারফ্লো করার মতো পরিস্থিতি নেই যে পরিমাণ তেল আসবে বা যাবে।”
বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এ. সত্তার মন্ডল মাঠ পর্যায়ের পরিস্থিতি বর্ণনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেন যে- “ কৃষির মাসল পাওয়ার-মেশিন পাওয়ার দ্বারা অনেকটাই রিপ্লেস। প্রায় ৪২ লক্ষ ডিজেল ইঞ্জিন কৃষিতে বিভিন্নভাবে, কেবল সেচ নয়, কৃষি সেক্টরে এমন ছোট বড় ইঞ্জিন রান করছে। আমি মনে করি আগামী দিনে কৃষি খাতে এসব মেশিনের সংখ্যা বাড়বে এবং ওই অনুপাতে ডিজেলের চাহিদাও বাড়বে ও ব্যবহারও বাড়বে যেহেতু কৃষকদের সংখ্যাও বাড়ছে।'' তাই কৃষিখাতে জ্বালানির সংকট উপেক্ষা করার মত নয়।
ট্রেড সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল (টিএসআই) এর চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহমদুলু হক জ্বালানীর সংকট জাতীয় অর্থনীতিতে কিরুপ প্রভাব ফেলবে তা বোঝাতে বলেন, “আর্ন্তজাতিক পার ব্যরেলে ৫ ডলার করে বাড়লে আমাদের ৪০০-৫০০ডলার বেড়ে যেয়। এই বাড়তি আর্থিক চাপ পুরো জাতীয় অর্থনীতির উপরই আসলে পরার কথা এটাকে খেয়াল রেখে আমাদের অল্টারনেটিভগুলো চিন্তা করতে হবে। তবে এই মহূূর্তেই আমাদের যেটা করতে হবে ‘Domestication of Source of Supplies’ আমাদের তো আগে মিডল ইস্টে ছিলো কিন্তু এখন অন্য জায়গাতেও সেই সোর্সিং টা বাড়ানো যায় কি না ।
এ সংকট মোকাবেলায় জ্বালানি মজদু যথাযথ রাখার অপর জোর দিয়েছেন বাংলাদেশ চেম্বার অফ ইন্ডাস্ট্রিজ (বিসিআই) এর চেয়ারম্যান আনোয়ার-উল আলম পারভেজ, তিনি বলেন, “আমি মনে করি যে, আগামীতে ইরান ও ইউএস এর যুদ্ধ লং টার্মে চলে যাচ্ছে, এবং বাংলাদেশে এনার্জি সিকিউরিটি ভেরি ইম্পরট্যান্ট। এনার্জি সেক্টরকে সিউকিউরড করার জন্যে শর্ট মিড লং টার্ম পলিসি নিতে হবে। ইমিডিয়েট যেটা করা দরকার সেটা হলো আমাদের কোল (কয়লাভিত্তিক) বেইজ প্লান্ট এগুলাকে সক্ষমতার ভিত্তিতে চালানো উচিত। আদানী ও ভারত থেকে যতোটুকু আসে সেগুলো দিয়েও আমাদের ডোমেস্টিক সক্ষমতা ধরে রাখা উচিত। এবং গ্যাসগুলো দিয়ে আমাদের ফার্টিলাইজার থেকে আরম্ভ করে ইন্ডাস্ট্রিয়াল যাদের সক্ষমতা থাকে সেগুলো আমাদের দেখা উচিত।
প্যানেলিস্টরা উল্লেখ করেন, সরবরাহ পরিস্থিতিতে বড় ধরনের উন্নতি না হলেও, চাহিদা ব্যবস্থাপনা এবং নজরদারি জোরদারের মাধ্যমে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়। তবে বিভিন্ন পাম্পে জ্বালানির অসম বণ্টন এবং গণমাধ্যমে স্থানীয় সংকটের অতিরিক্ত প্রচার জনমনে উদ্বেগ বাড়ায়, যা সংকটের ধারণাকে আরও তীব্র করে তোলে। এ থেকে বোঝা যায়, এমন পরিস্থিতিতে শুধু সরবরাহ নয়, জনসংযোগ ব্যবস্থাপনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশ পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন এর সভাপতি মোহাম্মদ নাজমলু হক সমাধানের দিকে ইঙ্গিত দেখিয়ে বলেছেন, “ আমাদের এখন রিনিউএবল এনার্জির রিসোর্সগুলো কাজে লাগাতে হবে আর গ্যাসের ক্ষেত্রে কুপ খননের জন্য জোড় দিতে হবে। তবে আশার আলো এই যে এই সরকার আসার পর ১৪০ টি কুপ খননের কাজ শুরু করেছে।”
আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ভারসাম্যপূর্ণ ও দূরদূর্শী নীতির প্রয়োজনীয়তা। সংকটকালে ভোক্তার আচরণ নিয়ে সমালোচনা থাকলেও, নীতি নির্ধারণ, সমন্বয়ের ঘাটতি এবং প্রস্তুতির দূর্বলতা সমানভাবে পর্যালোচনা করা জরুরি। ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট এড়াতে জ্বালানি সংরক্ষণ সক্ষমতা বদ্ধিৃ , চাহিদা পূর্বাভাস উন্নয়ন, সমন্বিত যোগাযোগ এবং জ্বালানি ব্যবস্থার স্থিতিস্থাপকতা বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়।
সমাপনী বক্তব্যে হোসেন জিল্লরু রহমান বলেন, “আমাদের আলোচনায় উঠে এসেছে যে বর্তমানে জ্বালানীর সংকট চলছে যা আমরা মোকাবেলাও করছি কিন্তু সেই সাথে ম্যানেজমেন্ট প্রক্রিয়া, সার্বিকভাবে আমদানী ইত্যাদি যদি আমরা মধ্যমেয়াদী কার্যক্রম যদি আরো জোড়ালোভাবে করতে না পারি তবে এ সংকটটা আরো গভীরভাবে থেকে যাবে, হয়ত বার বার ফিরেও আসবে।” তিনি সার্বিক আলোচনাকে পলিসি’র জন্য কার্যকরী কোথায় হতে পারে তা বিবেচনা করে বলেন- কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো একমাত্রিকভাবে চাহিদা নিয়ন্ত্রণের ওপর কেন্দ্রীভূত ছিল।
তাই তিনি নীতিগত সিদ্ধান্তের সুদরপ্রসারী প্রভাব বিবেচনার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং সতর্ক করেন যে আমলাতান্ত্রিক সীমাবদ্ধতা সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
প্যানালিস্ট হতে পুরো পরিস্থিতির মাঠ পর্যায়ে প্রভাবের কথা বিবেচনা করে তিনি আরও উল্লেখ করেন, “গনমাধ্যমের প্রয়োজন আরো তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং সঠিক তথ্যগুলো তাদের প্রতিবেদনে এ তুলে আনা দরকার। ম্যাসেজের দুর্বলতার কারণে আবার নতুন সমস্যা তৈরি হতে পারে, আমরা তো শুনলাম প্যানিকের কথা মজদেু র কথা যা অন্য প্রক্রিয়ায় ম্যানেজ করা হয়েছে কিন্তু ম্যাসেজিং এর বিষয়টাতেও সমন্বয় দরকার।”
সার্বিকভাবে, আলোচনায় একটি অভিন্ন উপলব্ধি উঠে আসে যে বাংলাদেশের জ্বালানি সংকট কেবল সাময়িক নয়, বরং গভীর কাঠামোগত দর্বুর্বলতার প্রতিফলন। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় প্রয়োজন সমন্বিত নীতি, শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি বৈচিত্র্য ও দক্ষতার প্রতি প্রতিশ্রুতি।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//