বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে রাশিয়া থেকে বেশি দামে নিম্নমানের গম আমদানিতে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত শেষ করে এনেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতিমধ্যে গম কেনা-সংক্রান্ত দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার। তখনকার খাদ্য সচিব ইসমাইল হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। কিন্তু এই দুর্নীতির মূল হোতা হিসেবে কুখ্যাত, ন্যাশনাল ইলেকট্রিক কোম্পানি নামের একটি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান মিয়া সাত্তার ছিলেন অধরা। উপরন্তু বর্তমান সরকারের আমলেও বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানে তাঁর যাতায়াত ও ব্যবায়িক তৎপরতা দুশ্যমান। তবে এবার দুদকের জাল থেকে বের হতে পারছেন না প্রভাবশালী এই ব্যাক্তিও।
জানতে চাইলে এই দুর্নীতি-সংক্রান্ত তদন্তদলের সদস্য, দুদকের সহকারী পরিচালক আফনান জান্নাত কেয়া বিষয়টি সম্পর্কে গণমাধ্যম কর্মীদের জানান, সাবেক খাদ্যমন্ত্রী ও তাঁর সহযোগীরা মিলে একটি অখ্যাত কোম্পানির মাধ্যমে রাশিয়া থেকে তৎকালীন বাজারদরের চেয়ে অনেক বেশি দামে গম আমদানি করেছিলেন। এ-সংক্রান্ত অভিযোগের তদন্ত শেষ পর্যায়ে রয়েছে। সুষ্ঠ অনুসন্ধানের স্বার্থে এই মূহুর্তে বিস্তারিত বলা যবে না। তবে আমদানির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের মতো যথেষ্ট ডকুমেন্ট দুদকের হাতে এসেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাইও করা হয়েছে। যে কোনা সময় মামলার সুপারিশ করে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।
গম আমদানি ছাড়াও মিয়া সাত্তার ভোলা গ্যাসক্ষেত্রে বাপেক্সের ঠিকাদার হিসেবে তিনটি গ্যাসকূপ খননের কাজে রাশিয়ার কোম্পানি গ্যাজপ্রমের হয়ে বিপুল অর্থের দুর্নীতি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই বিষয়টিও তদন্ত সংস্থার অনুসন্ধানে রয়েছে বলে জানা গেছে।
তা সত্ত্বেও তিনি রুশ রাষ্ট্রদূতকে সঙ্গে নিয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সাক্ষাৎ করেছেন জাতীয় সংসদের বর্তমান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং আরো কারো কারো সঙ্গে। একাধিক দেশের পাসপোর্ট ব্যবহারকারী মিয়া সাত্তারের এই তৎপরতাকে সন্দেহের চোখে দেখার যথেষ্ঠ কারন আছে। তিনি যে প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান তাঁর এক সহোদর ভাই আমিরুজ্জামান সোহেল সেই ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। তাঁর আরেক ভাই রায়হান গফুর সিরাজগঞ্জের সলঙ্গা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি।
গম কেনার কাহিনী : বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল। খাদ্যমন্ত্রী তখন সাধন চন্দ্র মজুমদার। রাশিয়া থেকে একের পর এক নিন্মমানের, এমনকি ইউক্রেন থেকে চুরি করা গমের চালানও বেশি দামে আমদানী করেছিলো একটি চক্র। জিটুজি পদ্ধতিতে এসব গম আমদানির চুক্তি করা হলেও রাশিয়ার হস্তক্ষেপে তা উপেক্ষা করে মিয়া সাত্তারের ন্যাশনাল ইলেক্ট্রিক গ্রুপকে দেয়া হয় মধ্যস্থতার দায়িত্ব। ২০২২ থেকে শুরু করে ২৪ সালের আগস্টে সরকার পতনের আগ পর্যন্ত ওই গ্রুপটির মাধ্যমে প্রায় ১১ লাখ টন গম আমদানী করে বাংলাদেশ।
তখনকার আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে প্রতি টন গমে ৫০-৬০ ডলার করে বেশি দামে নিন্মমানের গম সরবরাহ করে গ্রুপটি হাতিয়ে নেয় কয়েক হাজার কোটি টাকা। ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের মাধ্যমে খাদ্য শস্য আমদানির সমালোচানা এড়াতে আর ডি গ্লোবাল নামে একটি কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন মিয়া সাত্তারের ভাই আমিরুজ্জামান সোহেল। এই আর ডি গ্লোবালের মাধ্যমেই গম আমদানি করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুদকের তদন্তেও বেরিয়ে আসে এই দুর্নীতির সত্যতা। শুরু হয় দুদকের অনুসন্ধান।
খাদ্য মন্ত্রণালয় সুত্র জানায়, ২০১৫ সালেও ব্রাজিল থেকে নিন্মমানের গম আমদানী নিয়ে সমালোচনার মুখে পড়ে সরকার। কারণ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) মান অনুযায়ী গমে প্রোটিনের মান ১২ থেকে ১৮ শতাংশ হতে হয়। অথচ তখন সাড়ে ১১ শতাংশ প্রোটিন মানের গম আমদানি করা হচ্ছিল। এ নিয়ে সমালোচনার মুখে সরকার আমদানি করা গমের প্রোটিন মান পুন:র্মূল্যায়ন করে সাড়ে ১২ শতাংশ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু সাধন চন্দ্র মজুমদার দায়িত্ব গ্রহণের পর আবারও গম আমদানির বিনির্দেশে প্রোটিনের মান সাড়ে ১১ শতাংশে নামিয়ে আনে এবং খাদ্য বিশেষজ্ঞদের আপত্তি সত্ত্বেও ওই মানের গম আদমানি করে।
ভোলায় গ্যাসকূপ খনন : পেট্রোবাংলা ও বাপেক্সের সূত্র জানায়, ২০১৭ সালের মধ্যভাগে ভোলায় তিনটি গ্যাসকূপ খননের দরপ্রস্তাব নিয়ে যখন রাশিয়ার জ্বালানি কোম্পানি গ্যাজপ্রমের সঙ্গে বাপেক্সের নেগোসিয়েশন চলছিল তখন হঠাৎ করে আবির্ভুত হন মিয়া সাত্তার। নেগোসিয়েশন চলছিল তিনটি কূপের জন্য গ্যাজপ্রমের দেওয়া প্রায় ৫২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের দরপ্রস্তাব নিয়ে। গ্যাজপ্রম মাঝপথে সেই নেগোসিয়েশন স্থগিত করে বাপেক্সকে নতুন দরপ্রস্তাব দেয় প্রায় ৬৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বাড়তি দাম নিয়ে নেগোসিয়েশনে গ্যাজপ্রমের স্থানীয় প্রতিনিধিদল বদলে যেতে দেখা গেল। নতুন যারা আসেন তাঁদের পালের গোঁদা ছিলেন মিয়া সাত্তার।
নতুন সেই দরপ্রপ্রস্তাব নিয়ে নেগোশিয়েশন করতে বাপেক্স বিব্রত বোধ করলেও বিস্ময়করভাবে কয়েকদিনের মধ্যেই সেই প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। কারন মিয়া সাত্তারের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা তৎকালীন সরকারের নীতিনির্ধারক পর্যায় থেকে ওই বাড়তি দামেই গ্যাজপ্রমকে কূপ খননের কাজ দেওয়ার জন্য বাপেক্সকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ফলে রাষ্ট্রের ব্যয় বেড়ে যায় প্রায় ১২ মিলিয়ন ডলার। অথচ বাপেক্স নিজেই ওই কূপগুলো খনন করতে সক্ষম ছিল যাতে সর্বোচ্চ মোট ব্যয় হতো ১০-১২ মিলিয়ন ডলার।
বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাপেক্সের সাবেক এমডি মোহাম্মদ আলী গণমাধ্যম কর্মীদের বলেন, বিষয়টি অনেক আগের। তাই যতটুকু মনে আছে-কূপ খননবিষয়ক নেগোসিয়েশনের শুরুতে গ্যাজপ্রমের লোকাল এজেন্ট হিসেবে যারা আলোচনায় ছিলেন মাঝপথে তাঁদের জায়গায় ন্যাশনাল ইলেকট্রিক গ্রুপের প্রতিনিধি হিসেবে অন্য লোকেরা চলেন আসেন। একটি দরপ্রস্তাব নিয়ে আলোচনার মধ্যেই তাঁরা নতুন একটি দরপ্রস্তাব উত্থাপন করেন। এভাবে একটি প্রতিষ্ঠানের দুটি দরপ্রস্তাব নিয়ে কীভাবে আলোচনা করা যায় তা নিয়ে অনেক কথা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নেগোসিয়েশন করতে হয়েছে। দুটি দরপ্রস্তাবের মধ্যে কত অর্থের পার্থক্য ছিল তা মনে করতে পারছি না। তবে বাপেক্স এই কূপগুলো অনেক কম খরচে খনন করতে সক্ষম ছিল।
উল্লেখ্য, গ্যাজপ্রম উচ্চমূল্যে সরকারের কাছ থেকে যতগুলো কূপ খননের ঠিকাদারি নিয়েছে তার সবগুলো কূপই খনন করেছে উজবেকিস্তানের কোম্পানি এরিয়ল। মিয়া সাত্তারের ক্যারিশমায় গ্যাজপ্রম উচ্চমূল্যে সরকারের কাছ থেকে কাজ পেয়েছে এবং তার চেয়ে অনেক অনেক কম দামে এই কোম্পানিকে ঠিকাদার নিয়োগ করে কূপগুলো খনন করিয়েছে।
এসব দুর্নীতিমূলক কাজের মূল হোতা মিয়া সাত্তার রুশ সরকারের বিশেষ ঘনিষ্ঠ এবং একটানা দশ বছর মস্কোতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সাইফুল ইসলামের অত্যন্ত স্নেহধন্য ছিলেন। মিয়া সাত্তারের নাম বাংলাদেশে প্রথম শোনা যায় সাবেক রাষ্ট্রপতি হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদের আমলে রাশিয়ার কাছ থেকে যুদ্ধ বিমান মিগ-২৯ কেনা-সংক্রান্ত দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হিসেবে। তারপর বিভিন্ন সময় পতিত সরকারের নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে যোগসাজশে গম সরবরাহ, গ্যাসকূপ খনন, পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রভৃতি বড় বাজেটের কাজের মধ্যে ঢুকে তিনি অবাধে দুর্নীতি করে গেছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে মিয়া সাত্তার বাংলাদেশে না এলেও নির্বাচনের পর অন্য দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার করে দুইবার এসেছেন বলে জানা গেছে। এখন নতুন সরকারের সঙ্গেও ঘনিষ্টতা বাড়াতে তাঁর চেষ্টা দৃশ্যমান।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য মিয়া সাত্তারের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ফোন করা হলে, সাংবাদিক পরিচয় পেয়েই ‘আমি জার্নালিস্টদের সঙ্গে কোনো বিষয়ে কথা বলি না’ বলেই ফোন কেটে দেন। আর তাঁর ভাই আমিরুজ্জামান সোহেল বলেন, ‘খাদ্য মন্ত্রণালয় জিটুজি পদ্ধতিতে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি করে গম আমদানি করেছে। এ বিষয়ে জানতে হলে আপনাকে ফুডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে কোনো লাভ নাই।’
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//