পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়, ঝরনা ও সবুজ অরণ্য বাংলাদেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ। কিন্তু এই নৈসর্গিক সৌন্দর্যের আড়ালে দীর্ঘদিন ধরে চলমান সশস্ত্র সংঘাত, চাঁদাবাজি, অপহরণ ও আধিপত্য বিস্তারের রাজনীতি অঞ্চলটিকে বারবার অস্থিতিশীল করে তুলেছে। ১৯৯৭ সালের পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির মাধ্যমে যে স্থায়ী শান্তির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, প্রায় তিন দশক পরও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বরং চুক্তি প্রত্যাখ্যান করে ১৯৯৮ সালে আত্মপ্রকাশ করে ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ), যা পরবর্তী সময়ে পার্বত্য অঞ্চলের অন্যতম প্রভাবশালী সশস্ত্র সংগঠনে পরিণত হয়।
ইউপিডিএফের দাবি ছিল, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি পাহাড়িদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে পারেনি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সংগঠনটির বিরুদ্ধে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, অস্ত্র সংগ্রহ এবং প্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠনের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের অসংখ্য অভিযোগ ওঠে। ফলে রাজনৈতিক দাবিদাওয়ার আড়ালে তাদের সশস্ত্র কার্যক্রমই ক্রমে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে।
পাহাড়ে নিজেদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার জন্য ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, ঠিকাদার, পরিবহনশ্রমিক, কাঠ ও বাঁশ ব্যবসায়ী, এমনকি সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের কাছ থেকেও নিয়মিত অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন সময়ে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের ভাষ্য, এই অর্থের একটি বড় অংশ সংগঠনের সশস্ত্র শাখা পরিচালনা, সদস্যদের রক্ষণাবেক্ষণ এবং অস্ত্র সংগ্রহে ব্যয় হয়।
আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত প্রথম বড় ঘটনাগুলোর একটি ঘটে ২০০১ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি। রাঙামাটির নানায়ারচরে ড্যানিডা-অর্থায়িত সড়ক প্রকল্প পরিদর্শনে যাওয়া তিন ইউরোপীয় প্রকৌশলী অপহৃত হন, পরে মুক্তিপণের বিনিময়ে যাঁরা মুক্তি পান। ঘটনাটি পার্বত্য চট্টগ্রামের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছিল।
এর পাঁচ বছর পর, ২০০৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর নানিয়ারচরের বগাছড়িতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন নুরুল আলম গাজী নিহত হন। নিরাপত্তা বাহিনীর ভাষ্যমতে, ইউপিডিএফের সশস্ত্র সদস্যদের হামলায় তিনি প্রাণ হারান—পাহাড়ে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর চালানো অন্যতম বড় হামলা হিসেবে যা এখনো স্মরণ করা হয়।
বছরের পর বছর ধরে পার্বত্য অঞ্চলে ইউপিডিএফ ও অন্যান্য আঞ্চলিক সশস্ত্র সংগঠনের মধ্যে আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ অব্যাহত আছে। এসব সংঘর্ষে সংগঠনের সদস্যদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও প্রাণ হারিয়েছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অপহরণ, গুম, হত্যা ও সংঘর্ষের অসংখ্য ঘটনার তথ্য উঠে এসেছে।
অপহরণ ইউপিডিএফের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বেশি আলোচিত অভিযোগগুলোর একটি। বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থী, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষকে অপহরণের ঘটনা আলোচিত হয়েছে। ২০২৫ সালে খাগড়াছড়ি সদর এলাকা থেকে পাঁচ শিক্ষার্থী অপহরণের ঘটনা ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়; পরে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের পর তাঁদের উদ্ধার করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানায়।
নারীর প্রতি সহিংসতার অভিযোগও সংগঠনটির বিরুদ্ধে রয়েছে। অতীতে একাধিক ঘটনায় অপহরণ ও যৌন সহিংসতার অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এসব অভিযোগের অনেকগুলো এখনো বিচারিকভাবে নিষ্পত্তি না হলেও, ঘটনাগুলো পার্বত্য অঞ্চলের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
পাহাড়ে ইউপিডিএফের অস্ত্রের উৎস ও সীমান্ত-সংযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে, আর গত দুই বছরে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনীর একাধিক অভিযান সেই আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি ভারতের মিজোরামের মামিত জেলার সাইতাহ গ্রামের কাছ থেকে ছয়টি একে-৪৭ রাইফেল, ১৩টি ম্যাগাজিন ও প্রায় ১০ হাজার ৫০ রাউন্ড গুলিসহ বিপুল অস্ত্রভান্ডার জব্দ করে মিজোরাম পুলিশ। ওই অভিযানে মিয়ানমারভিত্তিক সশস্ত্র সংগঠন চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের (সিএনএফ) এক নেতাসহ পাঁচজন গ্রেপ্তার হন। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে বলা হয়, জব্দ হওয়া অস্ত্র-গোলাবারুদ সিএনএফ ও বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে সক্রিয় ইউপিডিএফ-প্রসীতের (ইউপিডিএফ-পি) মধ্যে লেনদেনের জন্য নির্ধারিত ছিল।
মামলাটি পরে হাতে নেয় ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)। প্রায় দেড় বছরের তদন্ত শেষে ২০২৫ সালের ১১ জুলাই আইজলের একটি আদালতে পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে সংস্থাটি। অভিযুক্তদের মধ্যে একজনের নাম আলোক বিকাশ চাকমা বলে সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে। এনআইএর ভাষ্যমতে, অভিযুক্তরা নিষিদ্ধ অস্ত্র-গোলাবারুদ ইউপিডিএফের সশস্ত্র ক্যাডারদের কাছে পাচারের ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন।
এরপর ২০২৬ সালের ২৫ মে মিজোরামের দাম্পা টাইগার রিজার্ভ এলাকা দিয়ে বাংলাদেশ সীমান্তের দিকে যাওয়ার সময় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) ও মিজোরাম পুলিশের যৌথ অভিযানে ইউপিডিএফ-প্রসীতের সন্দেহভাজন তিন সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার তিনজনের নাম আপন চাকমা, নিহার রঞ্জন চাকমা ও মণি কার্বারি চাকমা বলে জানানো হয়। তাঁদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সীমান্তবর্তী জঙ্গল থেকে বিপুল অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়। তদন্তকারীরা এটিকে মিজোরাম-বাংলাদেশ সীমান্ত ব্যবহার করে পরিচালিত একটি গোপন অস্ত্র ও রসদ-নেটওয়ার্কের ইঙ্গিত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
তবে এসব ঘটনার ভিত্তিতে ভারত সরকার বা ভারত রাষ্ট্র সরাসরি ইউপিডিএফকে আশ্রয় বা অস্ত্র সরবরাহ করছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রকাশ্য ও চূড়ান্ত প্রমাণ এখনো নেই। বরং প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে যা উঠে এসেছে তা হলো, ভারতীয় ভূখণ্ড—বিশেষত মিজোরামের দুর্গম সীমান্ত এলাকা—ব্যবহার করে পরিচালিত একটি আন্তঃদেশীয় অস্ত্রপাচার নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব, এবং সেই নেটওয়ার্কে ইউপিডিএফ-প্রসীতের কিছু সদস্যের সংশ্লিষ্টতা বা গ্রেপ্তারের তথ্য। উল্লেখযোগ্য বিষয়, এসব অস্ত্র জব্দ ও গ্রেপ্তারের অভিযান চালিয়েছে ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী ও তদন্ত সংস্থা নিজেরাই, যা রাষ্ট্রীয় মদদের বদলে বরং পাচার নেটওয়ার্ক ভাঙার প্রচেষ্টাকেই নির্দেশ করে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ, ভারত ও মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী দুর্গম বনাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচল ও অস্ত্রপাচারের জন্য ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এই ভৌগোলিক বাস্তবতা সীমান্ত নিরাপত্তাকে জটিল করে তুলেছে।
সাম্প্রতিক সময়ে কেএনএফ ও মিয়ানমারভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ইউপিডিএফের সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়েও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার পক্ষ থেকে উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। তবে এসব সম্পর্কের বিস্তারিত এখনো তদন্তাধীন কিংবা গোয়েন্দা মূল্যায়নের পর্যায়ে রয়েছে।
সব মিলিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থিতিশীলতার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে আছে অবৈধ অস্ত্র, সশস্ত্র গোষ্ঠীর আধিপত্য, চাঁদাবাজি এবং সীমান্তপথে অবৈধ নেটওয়ার্ক। শান্তিচুক্তির প্রায় তিন দশক পরও সাধারণ মানুষ যদি অপহরণ, গুলি ও চাঁদাবাজির আতঙ্কে বসবাস করেন, তবে তা শুধু আইনশৃঙ্খলার নয়, উন্নয়ন ও মানবিক নিরাপত্তারও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
এই বাস্তবতায় কার্যকর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ অস্ত্রের প্রবাহ বন্ধ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং অর্থবহ রাজনৈতিক সংলাপ—এই বিষয়গুলো একসঙ্গে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//