ইরানের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই এই সমুদ্রপথকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করবেন তিনি। তবে আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রেসিডেন্টের একতরফা ঘোষণায় কোনো ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হয়ে যায় না। ফলে ট্রাম্পের এমন ঘোষণা বাস্তবে কার্যকর করার সুযোগ আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার বিশ্লেষণধর্মী এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে তেল ও গ্যাস সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রুট হরমুজ প্রণালি নিয়ে সামরিক ও কূটনৈতিক অচলাবস্থা অব্যাহত রয়েছে। এর মধ্যেই গত শুক্রবার প্রণালিটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড হিসেবে ঘোষণা করার কথা জানান ট্রাম্প। ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হতো। ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অর্থহীন’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে ইরান।
একই সময়ে গত জুনে দুই দেশের মধ্যে সই হওয়া সমঝোতা স্মারকের মেয়াদও রোববার শেষ হওয়ার কথা। সংঘাত শুরুর পর থেকেই হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ রেখেছে ইরান। এর জবাবে ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রও নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে। এতে তেহরানের অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বেড়েছে।
কে আগে পিছু হটবে—এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ইরানকে নিয়ে ট্রাম্পের সামরিক হুমকি অব্যাহত রয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর বিভিন্ন সময়ে ইরানে হামলার হুমকি দিলেও শেষ মুহূর্তে সরে এসেছেন তিনি। ইরানের সঙ্গে আলোচনাকে ট্রাম্প ‘দাবা খেলার’ সঙ্গে তুলনা করেছেন।
গত শুক্রবার নিউইয়র্কের একটি পুলিশ একাডেমিতে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, ইরানকে পরাজিত করার পর খুব শিগগিরই তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড ঘোষণা করবেন। নৌ অবরোধের প্রসঙ্গ তুলে তিনি এমন দাবিও করেন যে, প্রণালিটি ইতোমধ্যেই কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
ট্রাম্পের ভাষায়, ‘মূলত এটাই তো হচ্ছে। আমাদের অবরোধ রয়েছে। আমরা না চাইলে কোনো জাহাজই সেখান দিয়ে যেতে পারবে না। ’তবে ইরানের দাবি, গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথটির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র নৌ অবরোধ আরোপের কথা বলছে, সামুদ্রিক চলাচলের তথ্য অনুযায়ী, কিছু জাহাজ এখনও হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করেছে।
ওয়াশিংটন থেকে আল জাজিরার কিম্বার্লি হালকেটের ভাষ্য, ট্রাম্প বক্তব্য দেওয়ার সময় হাসছিলেন। তার মতে, এতে ধারণা করা যায়, মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়তো বিষয়টি পুরোপুরি আক্ষরিক অর্থে তুলে ধরেননি। হালকেট বলেন, হরমুজ প্রণালির কর্তৃত্ব ইরান ও ওমানের। তবে প্রতিপক্ষের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে ট্রাম্প এ ধরনের বক্তব্য দিয়ে থাকেন এবং এবারও তার লক্ষ্য ইরান।
তবে তার বক্তব্যে একটি বিষয় স্পষ্ট—হরমুজ প্রণালিতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ কার্যকর রয়েছে। ট্রাম্পের মন্তব্যের কঠোর সমালোচনা করেছেন ইরানের কয়েকজন কর্মকর্তা। দেশটির বিচার বিভাগের প্রধান মার্কিন প্রেসিডেন্টকে অপরাধী ও ‘বুদ্ধিহীন’ বলে মন্তব্য করেন। একই সঙ্গে ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অর্থহীন’ আখ্যা দিয়ে হরমুজ প্রণালি ইরানের বলে দাবি করেন তিনি।
ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদিও বলেন, টুইট, বিমানবাহী রণতরী, কোনো আদেশ কিংবা নির্বাচনী বক্তৃতার মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দখল করা সম্ভব নয়। তার দাবি, হরমুজ প্রণালি ইরানের ছিল, ইরানের আছে এবং ইরানেরই থাকবে। প্রণালিটি কখন বন্ধ বা খোলা হবে, সেটিও ইরানই সিদ্ধান্ত নেবে বলে জানান তিনি।
এদিকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের সঙ্গেও আলোচনা করছে ইরান। প্রণালিটির অপর উপকূলীয় দেশ ওমান। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানিয়েছেন, তেহরান ও মাসকাটের আলোচনা শিগগিরই শেষ হতে পারে।
তবে প্রণালিটি পুরোপুরি খুলে দেওয়ার বিষয়টি আলাদা বলে জানিয়েছেন আরাগচি। তার মতে, এ ক্ষেত্রে গত জুনের সমঝোতা স্মারকে যুক্তরাষ্ট্র যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা পূরণ করতে হবে। এর মধ্যে নৌ অবরোধ ও ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের বিষয় রয়েছে। অর্থাৎ, চলমান যুদ্ধে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে এসব ছাড় চাচ্ছে ইরান। যুদ্ধ শেষ করার শর্ত হিসেবেও শুরুতে তেহরানের দাবিগুলোর মধ্যে এসব বিষয় ছিল।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রেসিডেন্টের একতরফা ঘোষণায় কোনো ভূখণ্ডের মালিকানা পরিবর্তন করা যায় না। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সময়ের সহকারী ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ব্রুস ফেইনের মতে, মার্কিন সংবিধান অনুযায়ী ট্রাম্প এককভাবে কোনো ভূখণ্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করতে পারেন না।
তার ভাষ্য, কোনো ভূখণ্ড যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করতে সিনেট অনুমোদিত চুক্তি অথবা কংগ্রেসের আইন প্রয়োজন। লুইজিয়ানা ক্রয়, হাওয়াই ও পানামা খাল যুক্তরাষ্ট্রের অধিভুক্ত করা এবং স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধের পর পুয়ের্তো রিকো ও ফিলিপাইন অধিগ্রহণের ক্ষেত্রেও এ ধরনের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল।
ফেইনের মতে, ট্রাম্প যদি হরমুজ প্রণালি দখল করে সেটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ডে পরিণত করার চেষ্টা করেন, তাহলে আন্তর্জাতিক আইন এবং জাতিসংঘ সনদের আওতায় সেটি ‘আগ্রাসী যুদ্ধের অপরাধ’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//আর//