নারী ও পুরুষের আয়ের বৈষম্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে প্রতি বছর ১৮ সেপ্টেম্বর পালিত হয় আন্তর্জাতিক সমমজুরি দিবস। বিশ্বজুড়ে নারীরা এখনো পুরুষদের তুলনায় কম মজুরি পান। গড়ে নারী ও পুরুষের মজুরির ব্যবধান প্রায় ২০ শতাংশ বলে ধারণা করা হয়।
এই বৈষম্য বোঝাতে বলা হয়, বছরের একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত পুরুষরা যে পরিমাণ আয় করেন, একই পরিমাণ আয় করতে নারীদের বছরের শেষ পর্যন্ত কাজ করতে হয়। অর্থাৎ পুরুষ সহকর্মীর এক বছরের সমান আয় করতে নারীদের প্রায় আরও তিন মাস কাজ করতে হতে পারে।
কেন মজুরিতে পিছিয়ে নারীরা?
নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধানের অন্যতম কারণ গভীরভাবে প্রোথিত বৈষম্য। বিশেষ করে অভিবাসী নারীদের বড় একটি অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ করেন। ফলে তাদের কম মজুরি, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাবের মুখে পড়তে হয়।
এছাড়া নারীরা পুরুষদের তুলনায় প্রতিদিন গড়ে তিন ঘণ্টা বেশি অবৈতনিক যত্নের কাজ করেন। এর মধ্যে গৃহস্থালির কাজ, শিশু ও বয়স্কদের দেখাশোনার মতো দায়িত্ব রয়েছে।
মাতৃত্বও মজুরি ব্যবধান বাড়ানোর একটি কারণ। কর্মজীবী মায়েরা অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম মজুরি পান। সন্তানের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ব্যবধান আরও বাড়তে পারে।
নারী-পুরুষ সম্পর্কে প্রচলিত সামাজিক ধারণা, নিয়োগের ক্ষেত্রে বৈষম্য এবং পদোন্নতির সিদ্ধান্তেও বৈষম্য মজুরি ব্যবধান তৈরিতে ভূমিকা রাখে।
কমছে ব্যবধান, তবে গতি ধীর
নারী-পুরুষের সমান মজুরির নীতির প্রতি ব্যাপক সমর্থন থাকলেও বাস্তবে তা নিশ্চিত করার অগ্রগতি ধীর। নারী ও মেয়েদের সমতা ও ক্ষমতায়নের পথে ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত বৈষম্য, দারিদ্র্য এবং সম্পদ ও সুযোগ পাওয়ার ক্ষেত্রে অসমতা এখনো বড় বাধা।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাতেও নারী-পুরুষের সমতা ও সব নারী ও মেয়ের ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সব নারী ও পুরুষের জন্য পূর্ণাঙ্গ ও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান, শোভন কাজ এবং সমান মূল্যের কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
সমান মজুরি কেন জরুরি?
সমান মূল্যের কাজের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করা শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়, এটি মানবাধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের সঙ্গেও সম্পর্কিত। এর মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সমান মজুরি কনভেনশনেও সমান মূল্যের কাজের জন্য নারী ও পুরুষের সমান মজুরির নীতিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে শ্রমিক ও মালিক সংগঠনের মধ্যে আলোচনা, সংগঠন করার স্বাধীনতা এবং যৌথ দর-কষাকষিকে গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখা হয়।
জাতিসংঘ, জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা সরকার, নাগরিক সমাজ, নারী সংগঠন, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান, শ্রমিক ও মালিক সংগঠনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে সমান মজুরি নিশ্চিত করার উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানিয়েছে।
সমান মজুরি আন্তর্জাতিক জোট:
বিশ্বজুড়ে নারী ও পুরুষের সমান মজুরি নিশ্চিত করতে কাজ করছে সমান মজুরি আন্তর্জাতিক জোট। এটি আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, জাতিসংঘের নারী বিষয়ক সংস্থা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার যৌথ উদ্যোগ।
এই জোট সরকার, নিয়োগকর্তা, শ্রমিক এবং তাদের সংগঠনকে একসঙ্গে নিয়ে নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধান কমানোর জন্য বাস্তব ও সমন্বিত পদক্ষেপে সহায়তা করে।
বর্তমানে বৈশ্বিক, আঞ্চলিক ও জাতীয় পর্যায়ে নারী-পুরুষের মজুরি ব্যবধান কমাতে কাজ করা অন্যতম প্রধান বহু-পক্ষীয় উদ্যোগ হিসেবে এই জোট কাজ করছে।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//