সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে ভাস্কর্য না বানিয়ে পানির ফোয়ারা নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়।
এছাড়া ৭ মার্চের ভাষণের ‘হলোগ্রাফিক থ্রিডি’ উপস্থাপনায় পরিবর্তন আনারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রকল্প বিষয়ে গত ৬ অগাস্ট মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অগ্রগতি প্রতিবেদনে এসব পরিবর্তনের (রিস্কোপিং ও রিপারপসিং) উদ্যোগ তুলে ধরা হয়েছে।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘ঢাকাস্থ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্বাধীনতা স্তম্ভ নির্মাণ’ নামে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালে। এর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের জুনে।
এই প্রকল্পের আওতায় বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানে দুটি ভাস্কর্য বানানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটলে সেই উদ্যোগ থেমে যায়। যে দুটি স্থানে ভাস্কর্য নির্মাণের কাজ চলছিল, সেসব স্থানে ভাঙচুরও চালানো হয়।
এরপর গত বছরের মার্চে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অরন্তর্বর্তী সরকার জানায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যোনে ভাস্কর্য দুটি হচ্ছে না।
এখন এসে ওই দুই স্থানে পানির ফোয়ারা বসানোর উদ্যোগ নিল বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার।
পানির ফোয়ারা বসানোর উদ্যোগের বিষয়ে গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান। তিনি এ বিষয়ে ‘দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে’ কথা বলার পরামর্শ দেন।
এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিবের দায়িত্ব পালন করা অতিরিক্ত সচিব হাসনা জাহান খানমও।
তিনি বলেন, “এ বিষয়ে কথা বলার জন্য আমাদের নির্দিষ্ট ব্যক্তি আছেন, আপনি শাহজাহান সাহেবের (শাহজাজান মিয়া) কাছে যান, তিনি বিস্তারিত বলবেন।”
শাহজাহান মিয়া আছেন মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন বিভাগের অতিরিক্ত সচিবের দায়িত্বে।
তিনি বলেন, “আমি এটা নিয়ে কীভাবে বলব, আমার বলার সুযোগ নাই। আপনি পলি করের কাছে যান। পলি কর বিস্তারিত বলবেন।”
মন্ত্রণালয় যে প্রতিবেদনে পানির ফোয়ারা বসানোর মতামত তুলে ধরেছে, সেখানে উপসচিব পলি করের সই রয়েছে।
যোগাযোগ করা হলে তিনি সংবাদমাধ্যমে কথা বলার অনুমতি না থাকার কথা বলেন। তবে নথিতে নিজের সই থাকার কথা তিনি স্বীকার করেছেন।
প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে থাকা প্রণব কুমার সাহার সঙ্গে চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা যায়নি। একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি ধরেননি।
এছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তার যে দাপ্তরিক কক্ষ রয়েছে, সেখানে একাধিক দিন গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি।
মন্ত্রণালয়ের নথি অনুযায়ী, প্রকল্পটির তৃতীয় পর্যায়ের (প্রথম সংশোধিত) প্রাক্কলিত ব্যয় ৩৯৭ কোটি টাকা। ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি ৭৫ দশমিক ৯১ শতাংশ; ভৌত অগ্রগতি ৯৪ শতাংশ।
মন্ত্রণালয়ের মতামত তুলে ধরে নথিতে বলা হয়েছে, প্রকল্পের আওতায় থানা নির্মাণ, ৭ মার্চের ভাষণ ও ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থান দুটিতে ভাস্কর্য নির্মাণের পরিবর্তে ওয়াটার ফাউন্টেন স্থাপন করা হবে। এজন্য নকশা পরিমার্জনের কথাও বলা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের ‘হলোগ্রাফিক থ্রিডি’ উপস্থাপনার বিষয়বস্তুতে পরিবর্তন আনার কথাও বলা হয়েছে নথিতে।
মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, “মন্ত্রণালয়ের লোকজনের চাপে পড়ে প্রকল্পের ভৌত কাজের এবং কিছু স্থাপনার নকশায় পরিবর্তনের কথা বলা হচ্ছে। এগুলো একনেকে উঠুক, তারপর দেখা যাবে, কীভাবে বাস্তবায়ন হয়।
“অতটা সহজ নয়, সব নকশা পরিবর্তন করা যায় না। এটা জাতীয় বিষয়, ইচ্ছে করলেই বাস্তবায়ন করা যায় না।”
তিনি বলেন, “৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের ঐতিহাসিক স্থান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এ দুটি স্থানের পরিকল্পনা বদলালে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।”
৭ মার্চের ভাষণ ও পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের স্থানটির অবস্থান উদ্যানের উত্তর-পশ্চিম কোণায়। ছবির হাটের ফটক দিয়ে ঢুকে কয়েক কদম এগোলেই হাতের বাঁয়ে স্থানটি পড়ে।
বুধবার সন্ধ্যায় সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ভাস্কর্য নির্মাণের স্থান টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। ভেতরে রয়েছে নির্মাণাধীন কিছু অবকাঠামো।
সূত্র : বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//