কুইক রেসপন্স সাপোর্ট টিম (কিউআরএস) বাংলাদেশে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা পরিস্থিতির অবনতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সাপোর্ট (আইএমএস)-এর সহায়তায় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে ভয়েস কর্তৃক নথিভুক্ত সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনার মাধ্যমে এ পরিস্থিতি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে মার্চ মাসের মধ্যেই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অধিকার লঙ্ঘনের ৩৪টি ঘটনার রেকর্ড করা হয়েছে, যা সহিংসতা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, আইনি হয়রানি এবং তথ্যপ্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টির একটি উদ্বেগজনক ধারাবাহিকতার প্রতিফলন।
এসব ঘটনা সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। বগুড়ায় সাংবাদিক শুভ কুন্ডু, সঞ্জীব কুমার এবং সাজ্জাদ হোসেন পল্লবকে একটি রাজনৈতিক মামলায় শতাধিক ব্যক্তির সঙ্গে আসামি করা হয়েছে, যা মুক্ত সাংবাদিকতার জন্য ভীতিকর। এই ঘটনায় আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহারও উদ্বেগজনক।
মাঠ পর্যায়ের সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের ঝুঁকি আরও বেড়ে চলেছে। রংপুরে স্থানীয় সংঘর্ষের সংবাদ সংগ্রহকালে সাংবাদিক ফেরদৌস জয়, মেহেদী হাসান, সাইফুল ইসলাম মুকুল এবং মাহবুব হোসেন সুমনের ওপর হামলার ঘটনা সাংবাদিকদের জন্য নিরাপত্তার অভাবকে ব্যাপকভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। একইভাবে, লক্ষ্মীপুরে সাংবাদিক তারেক মাহমুদ গণপিটুনির শিকার হন, যা গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ সহিংসতার একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার প্রতিফলন।
লক্ষণীয় যে, সাংবাদিকদের শুধু শারীরিকভাবে আক্রমণ করা নয়, বরং জবাবদিহিতা ব্যাহত করা এবং প্রমাণ সংগ্রহে বাধা দিতেও সহিংসতার ঘটনা ঘটানো হচ্ছে। চকরিয়ায় অবৈধ বালু উত্তোলনের তথ্যচিত্র ধারণকালে সাংবাদিক ছোটন কান্তি নাথ, ইকবাল ফারুক এবং এম. জিয়াবুল হকের ওপর হামলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ সময় তাদের সরঞ্জাম জব্দ ও ভাঙচুর করা হয়, যা সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতাকে বাধাগ্রস্ত করেছে।
একইসঙ্গে, প্রাতিষ্ঠানিক চাপ ও ক্ষমতার অপব্যবহার সাংবাদিকদের জন্য বিদ্যমান ঝুঁকিকে আরও গভীরতর করছে। সমালোচনামূলক খবর প্রকাশের পর বাংলাদেশ টাইমস-এর ২১ জন সাংবাদিককে আটক করার ঘটনা ভিন্নমত প্রকাশের পরিসর ক্রমেই সংকুচিত হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। একইভাবে, কুমিল্লায় সাংবাদিক রাসেল সরকার ও আব্দুল আলিমকে আটক এবং তাদের ধারণকৃত তথ্যচিত্র মুছে ফেলতে বাধ্য করার অভিযোগ প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে সহিংসতা এখনো একটি স্থায়ী ও ব্যাপক হুমকি হিসেবে বিদ্যমান। সাতক্ষীরায় অবৈধ বালু উত্তোলন সংক্রান্ত প্রতিবেদন প্রকাশের পর সাংবাদিক সামিউল মনিরের ওপর হামলার ঘটনা প্রাকৃতিক সম্পদ লুটপাট নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। একইভাবে, দুর্নীতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর এসএ টিভির সাংবাদিক হাসান আল সাকিব হুমকির মুখে পড়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে, যা প্রভাবশালী গোষ্ঠী এবং প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষমতাসম্পন্ন পক্ষগুলোর ভয়ভীতি প্রদর্শনের প্রবণতাকে নির্দেশ করে।
ঢাকায় সাংবাদিক প্রসূন আশিস ও আমিনুর রহমানের ওপর প্রকাশ্যে হামলার ঘটনা এটিই প্রতিফলিত করে যে, গণমাধ্যম কর্মীদের বিরুদ্ধে হুমকি এখন আর কেবল প্রত্যন্ত অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নেই; বরং তা ক্রমেই বিস্তৃত হচ্ছে। পাশাপাশি, ডিজিটাল ও তথ্যসংক্রান্ত নিরাপত্তাহীনতাও একটি ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের তথ্য ফাঁসের ঘটনায় হাজারো সাংবাদিকের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ্যে চলে আসার ঘটনা তাদের লক্ষ্যভিত্তিক হয়রানির ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
সমষ্টিগতভাবে, এসব ঘটনা বাংলাদেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে। আইনি চাপ, শারীরিক হামলা, ডিজিটাল নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপের সম্মিলিত প্রভাব ভীতি ও নীরবতার একটি পরিবেশ সৃষ্টি করছে, যা সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে, তথ্যপ্রাপ্তির অধিকার সীমিত করছে এবং গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
কুইক রেসপন্স সাপোর্ট টিম বাংলাদেশ সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় অবিলম্বে কার্যকর ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছে। এর মধ্যে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত সকল হামলা ও অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সুরক্ষায় আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা অন্তর্ভুক্ত। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সাংবাদিকদের অধিকার সমুন্নত রাখার বিষয়ে আরও সংবেদনশীল হতে হবে এবং সংবাদ সংগ্রহে বাধা বা ভীতি সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতে হবে।
আমরা আরও আহ্বান জানাই, বিদ্যমান আইনগুলোর প্রয়োগ পর্যালোচনা করে যেন সেগুলোর অপব্যবহার মুক্ত সাংবাদিকতার কাজে বাধা সৃষ্টির জন্য ব্যবহার না করা হয়। একইসঙ্গে ঝুঁকিতে থাকা সাংবাদিকদের জন্য নিরাপত্তা জোরদার করা এবং কার্যকর সুরক্ষা কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। পাশাপাশি, ডিজিটাল নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সাংবাদিকদের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষাকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সাংবাদিকদের নিরাপত্তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জনগণের তথ্য জানার অধিকারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সাংবাদিকদের জন্য নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা না গেলে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা টেকসইভাবে বজায় রাখা সম্ভব নয়। বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সুরক্ষায় সরকার, গণমাধ্যম ও নাগরিক সমাজের সমন্বিত উদ্যোগকে সহায়তা করতে কিউআরএস সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।
কুইক রেসপন্স সাপোর্ট টিম (কিউআরএস) হলো সাংবাদিক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, আদিবাসী অধিকারকর্মী এবং শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে গঠিত একটি প্ল্যাটফর্ম, যা ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যক্রম শুরু করেছে। এই উদ্যোগটি সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে সংঘটিত নিরাপত্তা লঙ্ঘনের ঘটনা পর্যবেক্ষণ, নথিভুক্তকরণ এবং প্রতিক্রিয়া প্রদানে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এই বিবৃতির মাধ্যমে তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ কার্যক্রমের সূচনা হলো। ভবিষ্যতে নির্ধারিত কাঠামোর আলোকে কিউআরএস নিয়মিতভাবে মাসিক অথবা ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করবে।
কিউআরএস টিমের সদস্যরা হলেন:
সোহরাব হাসান, সিনিয়র সাংবাদিক
আজিজুল পারভেজ, সাংবাদিক
আফরোজা সোমা, মিডিয়া অ্যান্ড জেন্ডার গবেষক
মায়নুল হাসান সোহেল, সাংবাদিক
দীপ্তি চৌধুরী, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব
মনজুর রশীদ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি
ডালিয়া চাকমা, আদিবাসী অধিকারকর্মী
সারাবান তাহুরা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি
ইসমাইল হোসেন, সাংবাদিক
শাখাওয়াত হোসেন, ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া সাপোর্ট
আহমেদ স্বপন মাহমুদ,ভয়েস।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//