দেশজুড়ে সরকারের খাল পুনঃখনন কর্মসূচি যখন বড় পরিসরে এগোচ্ছে, তখন চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে এ প্রকল্পের অর্থ ব্যয় ও কাজের হিসাব নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। শিকলবাহা ও চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের খাল পুনঃখনন প্রকল্পে সরকারি বরাদ্দ, শ্রমিক মজুরি, উপকরণ কেনাকাটা ও প্রকৃত কাজের পরিমাণে একাধিক অসঙ্গতির অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি, ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) ও কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনায় হিসাবের মধ্যে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে। সব মিলিয়ে প্রকল্প দুটিতে প্রায় ১৫ থেকে ২৫ লাখ টাকা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
এদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানেও খাল পুনঃখনন প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ উঠছে। চলতি বছর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাঁচ বছরে ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার খাল খননের লক্ষ্য রয়েছে।
নথি অনুযায়ী, শিকলবাহা খাল পুনঃখনন প্রকল্পের দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটার। শ্রমিক মজুরি বাবদ ৩৮ লাখ ৩৬ হাজার ৬১০ টাকা, নন-ওয়েজ খাতে ৩৮ লাখ ৮৭ হাজার ৯৩৩ টাকা এবং শ্রমিক সর্দার ভাতা চার হাজার ৩০০ টাকা মিলিয়ে মোট বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা।
তবে কর্ণফুলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সুজন কান্তি দাশের দাবি, প্রকল্পটির বরাদ্দ ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ নথির সঙ্গে পিআইওর বক্তব্যের পার্থক্য ১১ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা।
পিআইও জানান, ভ্যাটসহ প্রকল্পে প্রায় ২৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে মূল কাজের ব্যয় প্রায় ২৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রায় ৩৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে ওই অর্থ ফেরতের চালান বা সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
খাল পুনঃখননের কাজে আলী আকবর ও মোহাম্মদ জাফর নামে দুই শ্রমিক সর্দার যুক্ত ছিলেন।
পিআইওর হিসাবে আলী আকবরের কাজের মূল্য প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা। ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের তথ্য অনুযায়ী, তার কাজের মূল্য দুই লাখ ৮০ হাজার টাকা। আর আলী আকবর জানিয়েছেন, তিনি পেয়েছেন দুই লাখ পাঁচ হাজার টাকা।
অন্যদিকে মোহাম্মদ জাফরের ক্ষেত্রে পিআইওর দাবি, তাকে প্রায় ১৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, তার কাজের মূল্য ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা। দুই হিসাবের মধ্যে পার্থক্য প্রায় দুই লাখ ৬৪ হাজার টাকা।
প্রকল্পে ৩০টি পাইপ স্থাপনের কথা থাকলেও বাস্তবে ১৮টি পাইপ স্থাপন করা হয়েছে বলে জানা গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের হিসাবে এ খাতে ব্যয় প্রায় দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা। অথচ পিআইওর হিসাবে ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় চার লাখ টাকা।
এ ছাড়া শিকলবাহা খালের পাড়ে ৩০০টি বৃক্ষের চারা রোপণ করা হয়েছে। এ বাবদ দুই লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে।
ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, খোয়ারনগর থেকে দোনের খাল পুনঃখনন প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল এক কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা।
খোয়ারনগর খাল পুনঃখননের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শেখ আহমেদকে। খালের ব্রিজঘাট অংশের কাজ দেওয়া হয় সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাঈন উদ্দিনকে।
শেখ আহমেদ বলেন, তিনি কাজ করেছেন এবং তার কাজের বিল দেওয়া হয়েছে ৯০ হাজার টাকা। মাঈন উদ্দিন বলেন, খালের ব্রিজঘাট অংশে ৭৭০ ফুট কাজ করেছেন এবং মজুরি হিসেবে পেয়েছেন এক লাখ টাকা।
পিআইও সুজন কান্তি দাশের দাবি, খোয়ারনগর খাল পুনঃখননে সর্বমোট পাঁচ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ায় সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী অবশিষ্ট টাকা সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে।
কর্ণফুলীর এই প্রকল্পের বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় খাল পুনঃখনন নিয়ে একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। নোয়াখালী সদরে প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে ২৮ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন প্রকল্পে শ্রমিকের পরিবর্তে ভেকু ব্যবহার, গাছ কাটা, স্থাপনা ভাঙা এবং শ্রমিকের নামে বরাদ্দের অর্থ আত্মসাতের আশঙ্কার অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।
ফেনীর সাতটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পেও ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।
ফলে কর্ণফুলীর প্রকল্পেও বরাদ্দের সঙ্গে প্রকৃত কাজ, শ্রমিকের মজুরি, উপকরণ কেনাকাটা এবং অব্যয়িত অর্থ ফেরতের হিসাব স্বচ্ছভাবে যাচাইয়ের দাবি উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকেও খাল পুনঃখনন কাজে সুনির্দিষ্ট অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
স্থানীয়দের প্রশ্ন—খাল পুনঃখননের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রকল্পে কাগজে-কলমে এক হিসাব আর মাঠপর্যায়ে আরেক হিসাব হলে এর দায় কার? প্রকৃতপক্ষে কত টাকা ব্যয় হয়েছে এবং কত টাকা ফেরত গেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//