খাদ্যনীতি নিয়ে আলোচনা প্রায়ই মাংস খাওয়া অথবা পুরোপুরি মাংস বর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। বাস্তবে এর চেয়েও জরুরি ও বাস্তবসম্মত একটি প্রশ্ন রয়েছে। ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাস যা-ই হোক না কেন, প্রাণীদের অপ্রয়োজনীয় কষ্ট কমানো, তাদের কল্যাণ নিশ্চিত করা এবং মানবিকতার উচ্চতর মান বজায় রাখা এমন একটি লক্ষ্য, যা আমরা অর্জন করতে পারি।
দার্শনিক জেরেমি বেন্থাম একসময় এমন একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন, যা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক: “প্রশ্নটি হলো না, তারা কি যুক্তি দিতে পারে? কিংবা তারা কি কথা বলতে পারে? বরং প্রশ্ন হলো, তারা কি কষ্ট পেতে পারে?” দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পরও বাংলাদেশে এই প্রশ্নটি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। আমাদের সামনে শুধু কী খাব, তা নির্ধারণের প্রশ্ন নেই। প্রশ্ন হলো, আমরা যেখানেই প্রাণীর কষ্ট দেখতে পাই, তা স্বীকার করতে এবং যেখানে সম্ভব সেই কষ্ট কমাতে নৈতিক সাহস দেখাতে প্রস্তুত কি না।
নৈতিক নিরামিষবাদ বা Moral Vegetarianism মনে করে, বিকল্প থাকা সত্ত্বেও মাংস খাওয়া নৈতিকভাবে ভুল। এর মূল বক্তব্য হলো, কোনো প্রাণীর অনুভূতি ও কষ্ট পাওয়ার সক্ষমতাই নৈতিক বিবেচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এটি নিরামিষবাদ গ্রহণের আহ্বান নয়, কিংবা কৃষক, কসাই বা ভোক্তাদের নিন্দা করার প্রচেষ্টাও নয়। বরং এটি আমাদের ভাবতে আহ্বান জানায়, প্রাণীদের প্রতি আমাদের আচরণ কি সত্যিই সেই মূল্যবোধের প্রতিফলন, যেগুলোকে আমরা একটি মানবিক ও সহানুভূতিশীল সমাজের ভিত্তি বলে দাবি করি।
এই দৃশ্যগুলো অনেক সময় আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যায়। অথচ বহু খামারের প্রাণী জবাই হওয়ার আগ পর্যন্ত অত্যন্ত দুর্বিষহ জীবনযাপন করে। আমরা মাংসকে একটি পণ্য হিসেবে দেখি, তার আগে যে জীবন্ত প্রাণীটি ছিল, তাকে দেখি না।
বাংলাদেশে গবাদিপশুর প্রতি মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা এখনো নানা বাস্তব সমস্যার মুখোমুখি। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ প্রণীত হলেও বাস্তবায়নে নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অতিরিক্ত ভিড় করে প্রাণী পরিবহন, স্থানীয় কসাইখানায় রুক্ষ আচরণ এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতার কারণে পর্যাপ্ত পশুচিকিৎসা সেবা না পাওয়া এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
আমাদের খাদ্যব্যবস্থার এই উপেক্ষিত দিকটি একটি সহজ অথচ গভীর নৈতিক প্রশ্ন সামনে আনে: খামারের প্রাণীদের কষ্ট যদি কমানো সম্ভব হয়, তাহলে তা করার নৈতিক দায়িত্ব কি আমাদের নেই?
Animal Liberation গ্রন্থে অস্ট্রেলীয় দার্শনিক পিটার সিঙ্গার যুক্তি দিয়েছেন, বুদ্ধিমত্তা, ভাষা কিংবা প্রজাতি নয়, বরং কষ্ট অনুভব করার সক্ষমতাই কোনো প্রাণীকে নৈতিক বিবেচনার আওতায় আনে। কোনো প্রাণী যদি ভয়, ব্যথা ও যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে, তাহলে তার সেই কষ্টও নৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই দৃষ্টিকোণ থেকে শুধু প্রাণী বলেই তাদের অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দেওয়া এক ধরনের পক্ষপাত, যাকে সিঙ্গার speciesism বা প্রজাতিবাদ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
টম রেগান এই যুক্তিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছেন। কেবল কষ্টের বিষয়টি বিবেচনা না করে তিনি যুক্তি দিয়েছেন, অনেক প্রাণীর নিজস্ব অন্তর্নিহিত মূল্য রয়েছে, কারণ তারা সচেতন জীব; তাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা, পছন্দ এবং এমন জীবন রয়েছে, যা তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। তারা কেবল মানুষের ব্যবহারের জন্য সম্পদ নয়। প্রাণীদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের আমূল পরিবর্তনের পক্ষে রেগান আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে তাঁর চিন্তা আমাদের অন্তত এই প্রশ্নটি করতে বাধ্য করে: প্রাণীদের কেবল অর্থনৈতিক পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা কি সত্যিই নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য?
এই দার্শনিক ধারণাগুলো বাংলাদেশের দৈনন্দিন জীবন থেকে অনেক দূরের মনে হতে পারে। কিন্তু নিজেদের বাস্তবতার দিকে তাকালে এগুলো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। দীর্ঘ দূরত্বে অতিরিক্ত ভিড় করা যানবাহনে গবাদিপশু পরিবহন, প্রচণ্ড গরম ও মানসিক চাপের মধ্যে তাদের রাখা, কিংবা এমনভাবে পরিচালনা করা যাতে অপ্রয়োজনীয় আঘাত লাগে, এগুলো কোনো বিমূর্ত নৈতিক সমস্যা নয়।
সমস্যা শুধু এই নয় যে আমরা খাদ্যের জন্য প্রাণী ব্যবহার করছি। সমস্যা হলো, শেষ পর্যন্ত তাদের হত্যা করার আগে আমরা অনেক সময় তাদের অপ্রয়োজনীয় কষ্ট দিচ্ছি, যা অনেক ক্ষেত্রেই এড়ানো সম্ভব।
কেউ কেউ যুক্তি দিতে পারেন, যেহেতু প্রাণীগুলো মানুষের খাদ্য হিসেবে পালিত হয়, তাই তাদের কল্যাণের বিষয়টি গৌণ। কিন্তু এই যুক্তি খাদ্যের জন্য প্রাণী ব্যবহার এবং তাদের প্রতি অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্যকে উপেক্ষা করে। যারা নিরামিষবাদ প্রত্যাখ্যান করেন, তারাও স্বীকার করতে পারেন যে প্রাণীর প্রতি মানবিক আচরণ এবং এড়ানো সম্ভব এমন কষ্ট দেওয়ার মধ্যে নৈতিক পার্থক্য রয়েছে। সহানুভূতির পরিসর খাদ্য উৎপাদনের দরজায় এসে থেমে যাওয়ার প্রয়োজন নেই।
নিরামিষবাদ বা ভেগানবাদের বিরুদ্ধে বেশ কিছু যুক্তি রয়েছে। তবে এর পক্ষে থাকা কিছু গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি নিয়েও বাস্তবে খুব কম আলোচনা হয়। উদাহরণস্বরূপ, গবাদিপশুকে যে বিপুল পরিমাণ উদ্ভিজ্জ প্রোটিন ও শস্য খাওয়ানো হয়, তা সরাসরি মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করলে আরও বেশি মানুষকে খাদ্য সরবরাহ করা সম্ভব হতে পারে।
মানুষ নিঃসন্দেহে স্বাভাবিকভাবে সর্বভুক। কিন্তু কোনো আচরণ স্বাভাবিক হলেই তা সবসময় নৈতিকভাবে সঠিক হয় না, বিশেষ করে যখন আমাদের নৈতিক বিচারবোধ রয়েছে এবং বিকল্প বেছে নেওয়ার সুযোগও আছে। একই সঙ্গে মাংস পুষ্টিকর হলেও পরিকল্পিত ও সুষম নিরামিষ খাদ্য থেকেও শরীরের প্রয়োজনীয় পুষ্টি পাওয়া সম্ভব।
এই যুক্তিগুলোর সঙ্গে কেউ একমত হন বা না হন, একটি কেন্দ্রীয় বিষয় অস্বীকার করা কঠিন: এড়ানো সম্ভব এমন কষ্ট আমাদের নৈতিক মনোযোগ দাবি করে। এই সত্যটি স্বীকার করা কেবল প্রথম পদক্ষেপ। প্রকৃত অর্থবহ সহানুভূতি প্রতিফলিত হতে হবে আমাদের খাদ্যব্যবস্থা সংস্কারের মধ্য দিয়ে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে আমাদের কারখানাভিত্তিক পশুপালনের পরিবর্তে বাড়িতে বা ছোট পরিসরে মানবিক পরিবেশে পালিত প্রাণীকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত। গবাদিপশুর জন্য পর্যাপ্ত চারণভূমি নিশ্চিত করতে হবে, পোলট্রির জন্য পরিচ্ছন্ন ও স্বাস্থ্যকর শেড তৈরি করতে হবে, গাভীর দুধ দোহনে নৈতিক ও মানবিক পদ্ধতি অনুসরণ করতে হবে এবং মুরগি ও হাঁসের প্রাকৃতিক প্রজননকে উৎসাহিত করতে হবে।
একই সঙ্গে রাস্তার পাশে পোলট্রি বিক্রির সময় মুরগি ও হাঁসকে উল্টো করে ঝুলিয়ে রেখে নির্যাতন করার মতো নিষ্ঠুর প্রথা বন্ধ করতে হবে। গবাদিপশু পরিবহনের ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে, কসাইখানার কার্যক্রমে মানবিক মানদণ্ড নিশ্চিত করতে হবে এবং সামগ্রিকভাবে খামারের প্রাণীদের প্রতি অনুপযুক্ত আচরণ বন্ধ করতে হবে। ঈদুল আজহার পশুর হাটগুলোতেও আমরা যে নিষ্ঠুর আচরণ দেখতে পাই, তা বন্ধ করা জরুরি।
শেষ পর্যন্ত এই বিতর্কের মূল প্রশ্ন বাংলাদেশে মাংস খাওয়া বন্ধ করা উচিত কি না, তা নয়। মূল প্রশ্ন হলো, যেখানে আমরা অপ্রয়োজনীয় কষ্ট কমাতে পারি, সেখানে তা কমাতে আমরা কতটা প্রস্তুত।
কারণ, কেবল স্বীকার করতে অসুবিধা হয় বলে কোনো প্রাণীর কষ্টকে উপেক্ষা করলে আমরা কেমন সমাজে পরিণত হব?
আরও মানবিক একটি খাদ্যব্যবস্থা আমাদের ঐতিহ্য বা জীবিকা ধ্বংস করবে না। বরং তা আমাদের মানবিকতাকেই আরও শক্তিশালী করবে।
লেখক পরিচিতি:
ফারিজা আফশিন রাসনা
ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ULAB)-এর ইংরেজি বিভাগের একজন স্নাতক শিক্ষার্থী।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//