গত দুই দিন আগে হিমালয়ের পার্বত্য অঞ্চলে হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্টি হওয়া আকস্মিক বন্যায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে নেপাল ও পার্শ্ববর্তী তিব্বতের একাধিক এলাকা। ট্র্যাজেডির দুই দিন কেটে গেলেও এখন পর্যন্ত জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশা দিনে দিনে ক্ষীণ হয়ে আসছে। ধ্বংসস্তূপ, কাদা ও পাথর সরিয়ে নিখোঁজদের সন্ধানে ভারি যন্ত্রপাতি এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কুকুর ব্যবহার করে জোর উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছেন জরুরি সেবার কর্মীরা। তবে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে নদীর উজানে পলি ও পাথর জমে তৈরি হওয়া কৃত্রিম হ্রদগুলো, যা যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ে ফের বড় আকারের বিপর্যয় ঘটাতে পারে।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, নেপালে এখন পর্যন্ত ৪৬৯ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে। পাশাপাশি নেপাল ও প্রতিবেশী তিব্বত মিলিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন প্রায় এক হাজার মানুষ। গত বুধবার সকালে হিমালয় পর্বতমালার নদী অববাহিকায় একটি বিশালাকার হিমবাহ ভেঙে পড়ে। এর ফলে পাথর, বরফ, কাদা ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ একযোগে বিশাল স্রোত হয়ে নেমে আসে নদীগুলোতে।
এই ভয়াবহ বান কাঠমান্ডু ও তিব্বতের লহাসার সঙ্গে সংযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ পথগুলোর পাশাপাশি একাধিক পাওয়ার স্টেশন, সড়ক ও সেতু ধ্বংস করে দিয়েছে। এই পথটি পর্বতারোহী, ট্রেকার ও তীর্থযাত্রীদের মধ্যে অত্যন্ত জনপ্রিয়। নিখোঁজ ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৫৪০ জন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
উদ্ধার কাজে সামরিক বাহিনীর হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া হাজার হাজার মানুষের জন্য জরুরি ত্রাণ পৌঁছানোর পাশাপাশি আটকে পড়া দুর্গতদের উদ্ধার করে সেনা ক্যাম্পে আনা হচ্ছে। ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়া মানুষদের আর্তনাদে ভারি হয়ে উঠেছে বাতাস। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর একটি রসুয়া থেকে উদ্ধার হওয়া শেষ মানুষদের একজন দিবগা তামাং, যাকে এয়ারলিফট করে নুয়াকোটের একটি সেনা ক্যাম্পে আনা হয়েছে। স্বজনহারা দিবগা আকুল কণ্ঠে তার আকুতি প্রকাশ করে বলেন, আমাদের সব মানুষ চলে গেছে। তারা মারা গেছে। আমার জন্য অপেক্ষা করার মতো আর কেউ অবশিষ্ট নেই। সবকিছু এবং সবাই শেষ হয়ে গেছে। এখানেই সব কিছুর সমাপ্তি।
এদিকে ভয়াবহ বন্যায় নদীর গতিপথ রুদ্ধ হয়ে তৈরি হওয়া কৃত্রিম হ্রদগুলো এখন নতুন আতঙ্কের কারণ। নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভোটেকোশি নদীতে ধ্বংসাবশেষ আটকে সৃষ্ট হ্রদের পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে এবং যেকোনো সময় এটি উপচে পড়ে নতুন প্লাবন ঘটাতে পারে। অন্যদিকে, চীনা সীমানার ভেতরে প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি, যা প্রায় ১২শ'টি অলিম্পিক সাইজের সুইমিং পুলের সমপরিমাণ, আগামী তিন দিনের মধ্যে একটি রুদ্ধ হ্রদে জমা হতে পারে বলে বেইজিং জানিয়েছে। চীনা রাষ্ট্রীয় মাধ্যম দেশটির পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, আগামী ১ সেপ্টেম্বরের দিকে পানির প্রবাহ সর্বোচ্চ মাত্রায় পৌঁছালে হ্রদের বাঁধ ভেঙে চরম বিপদের আশঙ্কা রয়েছে। পরিস্থিতি পর্যালোচনায় আট সদস্যের প্রকৌশলী দল মোতায়েন করে ড্রোন ও ৩ডি মডেলিংয়ের মাধ্যমে তদারকি করা হলেও ভৌগোলিক প্রতিকূলতার কারণে উদ্ধার ও পর্যবেক্ষণ অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। বিষয়টি নিয়ে সিটিভি-কে প্রকৌশলী চেন হানসিয়াও বলেন, হিমবাহ ধসে হ্রদটি তৈরি হওয়ার পর এর চারপাশে খাড়া ও বিচ্ছিন্ন পাহাড় তৈরি হয়েছে। হ্রদের ঝুঁকি কমানোর জন্য সাধারণ পদ্ধতি হলো বাঁধের নিচু অংশ দিয়ে একটি ড্রেনেজ চ্যানেল কেটে পানি বের করে দেওয়া। কিন্তু পানির প্রবাহের গতি এবং হ্রদ ভরাট হওয়ার সময়ের হিসাব-নিকাশ করেই কেবল এর প্রশস্ততা ও গভীরতা নির্ধারণ করা সম্ভব।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//আর//