ডেঙ্গুর পিক মৌসুমে চট্টগ্রামে বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৩দিনে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন সাতজন। চলতি বছরে এ পর্যন্ত চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে, ৯ মাসে চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ৮৮৩ জন। এ বছরে চট্টগ্রামে মারা গেছেন ১২ জন। সেপ্টেম্বর মাসের ১৩ তারিখ পর্যন্ত ৮৪৭ জন আক্রান্ত ও ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। সিভিল সার্জন কার্যালয়ের গতকাল ১৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে আসে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, লিঙ্গভিত্তিক হিসাবে মোট ২,৮৮৩ জন রোগীর মধ্যে পুরুষ ১,৫০৩ জন, নারী ৭৯১ জন এবং শিশু ৫৮৯ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন ৮৭ জন; এর মধ্যে ৪২ জন পুরুষ, ২৪ জন নারী এবং ২১ জন শিশু।
মৃত্যুর হিসাব অনুযায়ী এ পর্যন্ত ৩ জন পুরুষ, ৭ জন নারী এবং ২ জন শিশুসহ মোট ১২ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে। আজকের হিসাব অনুযায়ী ২ জনের মৃত্যু হয়েছে, দুজনই নারী।
এ পরিস্থিতিতে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে একযোগে মাঠে নেমেছে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক)। জেলার প্রায় দুই হাজার মসজিদ ও মসজিদ প্রাঙ্গণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। অন্যদিকে নগরীতে তিন মাসের বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রামের আওতায় মশক নিধন ও লার্ভা ধ্বংসের কার্যক্রম জোরদার করেছে চসিক।
গত রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা ও সার্বিক পরিস্থিতি সরেজমিনে দেখতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালের ডেঙ্গু ওয়ার্ড পরিদর্শন করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন। এ সময় তিনি রোগীদের চিকিৎসার খোঁজখবর নেন এবং চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলেন।
পরিদর্শনকালে মেয়র ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের শারীরিক অবস্থা, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং ওয়ার্ডের সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত হন। রোগীদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন তিনি।
মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘রোগীদের অবস্থা অনুযায়ী সর্বাধুনিক চিকিৎসাপদ্ধতি প্রয়োগ এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি রোগীদের নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
এদিকে দেশব্যাপী তিন মাসব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ কর্মসূচির অংশ হিসেবে শনিবার চট্টগ্রামের প্রায় দুই হাজার মসজিদ ও মসজিদ প্রাঙ্গণে একযোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করেছে জেলা প্রশাসন। এতে প্রশাসন ও পুলিশের কর্মকর্তা, ইসলামিক ফাউন্ডেশনের কর্মকর্তা, আলেম-ওলামা, স্কাউট, গার্ল গাইড, বিভিন্ন পরিবেশসচেতন সংগঠনের সদস্য ও তরুণেরা অংশ নেন।
কর্মসূচির উদ্বোধনকালে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু চিকিৎসার ওপর নির্ভর করলে হবে না। এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি বাড়ি, কর্মস্থল ও আশপাশ পরিষ্কার রাখতে হবে। ‘আমরা আর একটি প্রাণও হারাতে চাই না। একটি জীবন চলে গেলে তা আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়,’ বলেন তিনি।
পরিচ্ছন্নতাকে নাগরিক দায়িত্ব হিসেবে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, পরিবেশ পরিষ্কার রাখা সবার দায়িত্ব। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ জুলাই থেকে প্রতি শনিবার বিভিন্ন স্থানে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চলছে। প্রথম দিনে প্রায় ৬ হাজার ২০০ কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশ নেন এবং সরকারি দপ্তর ও স্থাপনা থেকে প্রায় ১৩৫ মেট্রিক টন ময়লা-আবর্জনা অপসারণ করা হয়। পরে বিভিন্ন পুকুর-জলাশয়, পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত ও কালুরঘাটের জিয়া স্মৃতি কমপ্লেক্সসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালানো হয়। জেলার প্রায় ১ হাজার ২০০ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এ কার্যক্রমের আওতায় এসেছে।
এর আগে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে অনুষ্ঠিত এক কর্মশালায় জেলার দুই হাজার মসজিদ ও মসজিদ প্রাঙ্গণে একযোগে পরিচ্ছন্নতা অভিযানের ঘোষণা দেওয়া হয়। ইসলামিক ফাউন্ডেশন ও ইউনিসেফ আয়োজিত কর্মশালায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইমাম, খতিব ও ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।মশার প্রজননস্থল সৃষ্টির জন্য দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে ভ্রাম্যমাণ আদালতও পরিচালনা করা হচ্ছে।
চসিক জানিয়েছে, নগরীর ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ ক্রাশ প্রোগ্রামটি আগামী ১২ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত চলবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডেঙ্গুর পিক মৌসুমে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান উপায়।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//