ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনকে কেন্দ্র করে ক্যাম্পাসে ব্যাপক ক্ষোভ ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার দুপুরে এক ক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী সংগ্রহশালায় ঢুকে জিন্নাহর তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেন। পাশাপাশি ছাত্রদল, ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্র ফেডারেশনসহ বিভিন্ন ছাত্রসংগঠন এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সোমবার দিনভর সমালোচনা ও উত্তেজনার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনাটি তদন্তের জন্য সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানীকে আহ্বায়ক করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে।
জানা যায়, সংস্কারের পর গত রোববার ডাকসু সংগ্রহশালাটি পুনরায় দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়। নতুন করে সেখানে মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত করা হয়, যার মধ্যে ১৯৪৮ সালে রেসকোর্স ময়দানে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণার ছবিটিও ছিল। এছাড়া তৎকালীন ছাত্রসংঘের নেতা আবদুল মালেকের ছবিও সেখানে স্থান পায়।
উল্টোদিকে, স্বাধীনতাসংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আগে থেকে থাকা একক ও গৌরবোজ্জ্বল ছবিগুলো সরিয়ে ফেলা হয়। বিষয়টি জানাজানি হলে রোববার রাত থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে। সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উর্দু বিভাগের শিক্ষার্থী ও সাবেক ডাকসু ভিপি প্রার্থী আবু তৈয়ব হাবিলদার সংগ্রহশালায় গিয়ে জিন্নাহর ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলেন।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যে জিন্নাহ মাতৃভাষার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে শিক্ষার্থীদের গ্রেপ্তার করিয়েছিলেন, ডাকসুতে তাঁর কোনো স্থান হতে পারে না।
ছবি ছেঁড়ার ঘটনার পর ডাকসুর সাধারণ সম্পাদক ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এস এম ফরহাদ দাবি করেন, জিন্নাহর ছবির নিচে তাঁর বাংলা ভাষাবিরোধী অবস্থানের কথাও উল্লেখ করা হয়েছিল। উল্টো তিনি মন্তব্য করেন, ছবি ছিঁড়ে ফেলা ওই শিক্ষার্থী উর্দু বিভাগের হওয়ায় জিন্নাহর প্রতি বাড়তি দরদ থেকে কাজটি করে থাকতে পারেন।
অন্যদিকে, সোমবার বেলা তিনটার দিকে ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাংগঠনিক সম্পাদক অর্ক বড়ুয়ার নেতৃত্বে একদল শিক্ষার্থী জিন্নাহর ছেঁড়া ছবির জায়গায় ১৯৮১ সালে বায়তুল মোকাররমে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি টানিয়ে দেন।
এ ছাড়া ছাত্রদল ও ছাত্র ইউনিয়নসহ একাধিক বাম ছাত্রসংগঠন পৃথক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি ও সমাবেশের মাধ্যমে জিন্নাহর ছবি অপসারণ এবং বঙ্গবন্ধুর ছবি পুনর্বহালের জোর দাবি জানিয়েছে।
সার্বিক পরিস্থিতির মুখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম জানিয়েছেন, ডাকসুর এসব কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আগে থেকে কিছুই জানত না। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেওয়া এক লিখিত বক্তব্যে বলা হয়েছে, ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহ এবং আবদুল মালেকের ছবি প্রদর্শনের বিষয়টি ভাষা আন্দোলন ও স্বাধীনতার ইতিহাসের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং অগ্রহণযোগ্য।
গঠিত তদন্ত কমিটি জিন্নাহর ছবির পাশাপাশি ডাকসু কর্তৃক কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া ‘নির্ভীক জুলাই’ ও কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন এবং শিক্ষক মূল্যায়নের ওয়েবসাইট চালুর বিষয়গুলোও খতিয়ে দেখবে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন অনুযায়ী ডাকসুর এখতিয়ারবহির্ভূত বলে জানিয়েছে প্রশাসন।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//