জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ, ভুয়া শিক্ষাগত সনদ ব্যবহার, দাপ্তরিক ক্ষমতার অপব্যবহার, অবৈধ সম্পদ অর্জন, অর্থ পাচার এবং সহকর্মীর ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে চট্টগ্রাম সমবায় অধিদপ্তরের সহকারী পরিদর্শক মো. রাশেদুল আলমের বিরুদ্ধে।
এসব অভিযোগের তদন্ত করে তাঁর নিয়োগ পুনঃযাচাই, চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে গত ২৬ জুলাই সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধক ও মহাপরিচালকের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন সিলেটের দক্ষিণ সুরমা উপজেলা সমবায় কার্যালয়ের সহকারী পরিদর্শক শুভ্রাংশু চক্রবর্তী।
অভিযোগপত্রে শুভ্রাংশু চক্রবর্তী দাবি করেন, বিভিন্ন সময়ে তাঁর কাছ থেকে ধার হিসেবে মোট ৬ লাখ ৫০ হাজার টাকা নিয়েছেন রাশেদুল আলম। টাকা ফেরত না দিয়ে তাঁকে ভয়ভীতি, হুমকি ও মানসিকভাবে হয়রানি করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
লিখিত অভিযোগের সঙ্গে সংযুক্ত ব্যাংক এশিয়ার নথি ও লিগ্যাল নোটিশে এ অর্থের একটি অংশের বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেছে। ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আইনজীবীর মাধ্যমে রাশেদুল আলমকে দেওয়া লিগ্যাল নোটিশে তাঁর মক্কেল শুভ্রাংশু চক্রবর্তীর পাওনা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ফেরতের দাবি করেন। নোটিশে বলা হয়, ২০২০ সালের ২ জুন এবং ১৬ জুলাই , ২০২১ সালের ২৪ নভেম্বর যথাক্রমে ৫০ হাজার, ১ লাখ ও ২ লাখ টাকা রাশেদুল আলমের ব্যাংক এশিয়ার হিসাবে জমা দেওয়া হয়। বাকি ৩ লাখ টাকা তাকে নগদ সরাসরি দেওয়া হয় বলে জানান শুভ্রাংশু চক্রবর্তী।
অভিযোগপত্রের সাথে সংযুক্ত ব্যাংক রশিদে ২৪ নভেম্বর ২০২১ তারিখে রাশেদুল আলমের হিসাব নম্বর ০৩০৩৪০০৫২৪৭-এ ২ লাখ টাকা জমা দেওয়ার তথ্য রয়েছে। জমাদাতার নাম হিসেবে শুভ্রাংশু চক্রবর্তীর নাম এবং তাঁর মোবাইল নম্বরও উল্লেখ আছে। অপর দুটি রশিদে ২০২০ সালের ২ জুন ও ১৬ জুলাই নগদ টাকা জমার স্ট্যাম্প রয়েছে।
লিগ্যাল নোটিশে বলা হয়, টাকা নেওয়ার সময় রাশেদুল আলম ছয় মাসের মধ্যে তা ফেরত দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর পরও টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি। বরং একপর্যায়ে শুভ্রাংশুর সঙ্গে সব ধরনের যোগাযোগ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে নোটিশে দাবি করা হয়। নোটিশ পাওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধ না করলে আদালতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও এতে উল্লেখ করা হয়।
নিয়োগ নিয়েও অভিযোগ
শুভ্রাংশু চক্রবর্তীর লিখিত অভিযোগে রাশেদুল আলমের সরকারি চাকরিতে নিয়োগ নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগে বলা হয়, ২০০৪ সালে ‘অফিস সহায়ক’ পদে সিলেট জেলার স্থায়ী বাসিন্দা কোটায় চাকরি পান রাশেদুল আলম। কিন্তু তাঁর জাতীয় পরিচয়পত্র ও জন্মসূত্র যাচাই করলে প্রকৃত বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, তৎকালীন সহকারী পরিদর্শক সজল চক্রবর্তী ও জেলা সমবায় কর্মকর্তা তারেকুজ্জামানের যোগসাজশে তথ্য গোপন করে তিনি ওই নিয়োগ পান। একই সঙ্গে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার তোয়াকুল ইউনিয়নের বিছানাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয়ের নামে ভুয়া শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ ব্যবহারের অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, ওই নামে কোনো ব্যক্তি বিদ্যালয়টিতে পড়াশোনা করেননি।
চট্টগ্রামেই ১৫ বছরের বেশি চাকরি :
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ২০০৭ সাল থেকে প্রায় ১৯ বছর ধরে রাশেদুল আলম চট্টগ্রাম বিভাগীয় অফিস, জেলা অফিস ও মেট্রো অফিসে কর্মরত রয়েছেন। তাঁর বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমবায় দপ্তরে নিয়োগ, পদোন্নতি ও পোস্টিংয়ের ওপর প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও করা হয়েছে। ডবলমুরিং থানা সমবায় কার্যালয়ের অধীন বিভিন্ন সমিতির নির্বাচন ও অডিটে অনিয়মের মাধ্যমে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে যোগসাজশ করে অর্থ আদায় করছেন বলেও অভিযোগে দাবি করা হয়েছে।
সম্পদ ও অর্থ পাচার:
রাশেদুল আলমের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারেরও অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, বিভিন্ন প্রভাবশালী ব্যক্তি ও সমবায় দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তার আর্থিক সমন্বয়ক বা এজেন্ট হিসেবে কাজ করেছেন তিনি। এসব কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অর্জিত অর্থে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় নিজ বাড়িতে বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ এবং ঢাকা ও চট্টগ্রামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট কেনার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া তাঁর ভাই মধ্যপ্রাচ্যে তাঁর পাচার করা অর্থে কেনা একটি ফ্ল্যাটে থেকে পড়াশোনা করছেন বলেও অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে। ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত রাশেদুল আলমের ব্যাংক এশিয়ার হিসাবের লেনদেন পরীক্ষা করলে কথিত অবৈধ লেনদেনের তথ্য পাওয়া যাবে বলে অভিযোগকারী দাবি করেছেন। রাশেদুল আলম তাঁর চাচাতো ভাই তানভীরুল আলমসহ আত্মীয়স্বজন ও শ্বশুরবাড়ির প্রায় ২০ জনকে অবৈধভাবে চাকরি পাইয়ে দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
সরকারি বাসার ভাড়া ও বিদ্যুৎ বিল বকেয়ার অভিযোগ:
অভিযোগে বলা হয়, সমবায় দপ্তরের সাধারণ কর্মচারীদের কাছ থেকেও ক্ষমতার ভয় দেখিয়ে প্রায় অর্ধকোটি টাকা নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমবায় অফিসের সরকারি বাসার ভাড়া ও এসির বিদ্যুৎ বিল বাবদ প্রায় ২ লাখ টাকা বকেয়া রয়েছে বলে অভিযোগকারী দাবি করেছেন।
লিখিত অভিযোগের শেষাংশে রাশেদুল আলমের নিয়োগ প্রক্রিয়া পুনঃযাচাই, চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার, অভিযোগকারীর পাওনা টাকা উদ্ধার এবং তাঁর বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার আবেদন করা হয়েছে।
রাশেদুল আলম জানান, অভিযোগকারী শ্রভ্রাংশু চক্রবর্তীর সাথে আমার কোন লেনদেন হয়নি। ওনি চাকরিসূত্রে আমার বাবার কলিগ ছিল। বাবার সাথে লেনদেন হয়েছে। বাবার ওনার কাছ থেকে যে টাকা পেত সেটা ব্যাংক এশিয়ার একাউন্টের মাধ্যমে পরিশোধ করেছেন। টাকা চেয়ে যে লিগ্যাল নোটিশটি দেওয়া হয়েছে তার জবাব আমি আমি আইনজীবীর মাধ্যমে দিয়েছি। অন্য অভিযোগের বিষয়ে রাশেদুল আলম জানান, এগুলো সব মিথ্যা ও বানোয়াট। এসব অভিযোগের কোন সত্যতা নেই।
চট্টগ্রাম জেলা সমবায় অফিসার সিফাত উল্লাহ তাসনিম জানান, আমার কাছে এ ধরনের কোন অভিযোগ আসেনি। অভিযোগ পেলে যাচাই-বাছাইয়ের পর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, ১৫ বছর ধরে চট্টগ্রামে কাজ করার বিষয়টি আমার জানা নেই। ওনি ডবল মুরিং সমবায় কার্যালয়ে তিন বছর ধরে কর্তব্যরত আছেন । চট্টগ্রাম বিভাগের বিভিন্ন অফিসে কাজ করে থাকতে পারেন।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//