Advertisement
সিডিএ গার্লস স্কুলে তিন কর্মচারীর চাকরিচ্যুত
চট্রগ্রাম ব্যুরো
Publish: Monday, 7 September, 2026, 12:44 AM

একটি অভিযোগের জেরে চাকরি হারিয়েছেন একজন, সাময়িক বরখাস্ত হয়েছেন আরেকজন। অন্যজনের এক বছরের ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে। এরপর কেটে গেছে ১৪ মাসের বেশি সময়। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে নেওয়া বিভাগীয় ব্যবস্থার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। ফলে চাকরি ফিরে পাওয়ার অপেক্ষায় দিন কাটছে তিন শিক্ষক-কর্মচারীর। কারও সংসারে বন্ধ হয়ে গেছে নিয়মিত আয়, কারও পরিবার চলছে ধারদেনায়। দীর্ঘ এই অনিশ্চয়তা এখন প্রশাসনিক শাস্তির চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিয়েছে মানবিক সংকট হিসেবে।

চট্টগ্রামের চান্দগাঁও থানার মোহরা এলাকার সিডিএ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের তিন শিক্ষক-কর্মচারীকে অন্যায়ভাবে চাকরিচ্যুত ও শাস্তি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তানজিনা চৌধুরীর বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের দাবি, তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তার নিষ্পত্তির ক্ষেত্রেও অনুসরণ করা হয়নি নির্ধারিত প্রক্রিয়া।

শাস্তির শিকার তিনজন হলেন—অ্যাডমিন অফিসের এস এম আসাদুজ্জামান, কম্পিউটার অপারেটর মো. আশরাফ উদ্দীন চৌধুরী এবং খণ্ডকালীন কম্পিউটার অপারেটর শেখ হাসনাত আবেদীন মির্জা।

তাদের মধ্যে একজনকে চাকরিচ্যুত, একজনকে সাময়িক বরখাস্ত এবং অপরজনের এক বছরের ইনক্রিমেন্ট স্থগিত করে প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

১৪ মাস ধরে চাকরি ফেরার অপেক্ষা:

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ২০২৫ সালের ১ থেকে ৩ জুন সরকারি ছুটির সময়ে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকার অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তাদের দাবি,সরকারী বন্ধের  ওই সময়ে প্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে—এমন কোনো লিখিত বা মৌখিক নির্দেশনা তাদের দেওয়া হয়নি।সরকারী বন্ধ থাকায় তারা প্রতিষ্টানে উপস্থিত ছিলেন না।

শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আগে নিয়ম অনুযায়ী ১০ কর্মদিবস সময় দেওয়ার কথা থাকলেও তাদের মাত্র তিন দিন সময় দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা।

এরপর তদন্ত, সভা ও রেজুলেশনের মধ্য দিয়ে ১৪ মাসের বেশি সময় পার হলেও তাদের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে চাকরি হারানো কর্মীরা একদিকে বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত, অন্যদিকে চাকরিতে ফেরার আশায় অন্য কোথাও স্থায়ীভাবে কাজেও যুক্ত হতে পারছেন না।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, প্রশাসনিক একটি সিদ্ধান্তের দীর্ঘসূত্রতার কারণে তাদের পরিবারের সদস্যদেরও এর খেসারত দিতে হচ্ছে। সন্তানদের পড়াশোনা, সংসারের ব্যয় ও নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ মেটানো কঠিন হয়ে পড়েছে। চাকরির পাশাপাশি তারা হারিয়েছেন সামাজিক ও মানসিক স্থিরতাও।


১৮০ দিনের নিয়ম কোথায়?

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের বেসরকারি মাধ্যমিক-১ শাখা থেকে ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট জারি করা পরিপত্রে স্বীকৃত বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে বিভাগীয় কার্যক্রম ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে নিষ্পত্তির নির্দেশনা রয়েছে।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কার্যক্রম নিষ্পত্তি না হলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক-কর্মচারী নিজ পদে পুনর্বহাল এবং বিধি অনুযায়ী বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য—এমন নির্দেশনাও রয়েছে।

কিন্তু সিডিএ গার্লস স্কুলের তিন কর্মীর ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা কার্যকর হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। ১৮০ দিনের জায়গায় পেরিয়ে গেছে ১৪ মাসের বেশি সময়। তবু চাকরিতে ফেরার কোনো সিদ্ধান্ত পাননি তারা।
বরখাস্ত হয়েও বিদ্যালয়ের কাজে আশরাফ তিন কর্মীর মধ্যে কম্পিউটার অপারেটর মো. আশরাফ উদ্দীন চৌধুরীর বিষয়টি আরও প্রশ্ন তৈরি করেছে। সাময়িক বরখাস্ত থাকার পরও তাকে বিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজে যুক্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আশরাফের দাবি, তাকে ছাড়া অ্যাকাউন্টস শাখার নিয়মিত কার্যক্রম চালানো কঠিন হওয়ায় বিভিন্ন সময় কর্তৃপক্ষ তাকে ডেকে কাজ করিয়েছে। অথচ আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে পুনর্বহাল করা হয়নি।

আশরাফ জানান, ২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। ২৩ সেপ্টেম্বর ওই সভার রেজুলেশন অনুমোদনের পর তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। পরে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে পরিচালনা কমিটির আরেকটি সভা হয় এবং ওই সভার রেজুলেশন মে মাসে অনুমোদন করা হয়।

তার অভিযোগ, পরবর্তী সভার সিদ্ধান্তগুলো ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নিজের সুবিধামতো পরিবর্তন করেছেন।

শাস্তির পাশাপাশি প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ:
তিন কর্মীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টির পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও একাধিক অভিযোগ করেছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।

তাদের দাবি, গত সাত বছর ধরে প্রতিষ্ঠানের কোনো আর্থিক অডিট হয়নি। অফিস খরচের নামে প্রতি মাসে প্রায় ২০ হাজার টাকা উত্তোলন ও ব্যয়ের ক্ষেত্রেও ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের সরাসরি ভূমিকা রয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।

প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির সভা নিয়মিত না হওয়ার অভিযোগও রয়েছে। বিধি অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন মাসের মধ্যে সভা হওয়ার কথা থাকলেও প্রায় আট মাস ধরে কোনো সভা হয়নি বলে দাবি করেছেন শিক্ষকরা।

নিয়োগ, স্থায়ীকরণ ও বেতন ব্যবস্থাপনাতেও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ উঠেছে। যোগ্যতা পূরণ করেও কয়েকজন শিক্ষক-কর্মচারী সাত-আট বছর ধরে অস্থায়ী অবস্থায় রয়েছেন বলে অভিযোগ।


অন্যদিকে, দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া ছয় শিক্ষককে ব্যবস্থাপনা কমিটির অনুমোদন ছাড়াই স্থায়ী করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। পরে কমিটির সদস্যদের আপত্তিতে সেই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হয়। বর্তমানে আবার তাদের স্থায়ী করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

১৮ মাসেও স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই:
প্রতিষ্ঠানে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়াও প্রায় ১৮ মাস ধরে আটকে থাকার অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন শিক্ষক দাবি করেন, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ও তাঁর ঘনিষ্ঠ একটি বলয়ের কারণে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগোচ্ছে না।

এ ছাড়া অস্থায়ী শিক্ষকদের বাড়িভাড়া ভাতা, দীর্ঘদিন চাকরি করেও স্থায়ীকরণ না হওয়া এবং টাইম স্কেল থেকে বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

যা বলছেন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক
তিন শিক্ষক-কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রসঙ্গে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তানজিনা চৌধুরী বলেন, সিডিএ তাদের বিরুদ্ধে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। তদন্তে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

১৮০ দিনের মধ্যে বিভাগীয় কার্যক্রম নিষ্পত্তি না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, রেজুলেশন করা হলেও তা এখনো চূড়ান্তভাবে পাস হয়নি। ফাইলে বরখাস্তের বিষয়টি কীভাবে এসেছে—এ প্রশ্নে তিনি তদন্ত কমিটির সদস্যদের দায়ী করেন।

বরখাস্তের পরও আশরাফ উদ্দীনকে দিয়ে কাজ করানোর অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, তাকে ডেকে কাজ করানো হয়নি; তিনি স্বেচ্ছায় এসে কাজ করেছেন। তবে বরখাস্ত থাকা অবস্থায় একজন কর্মী কীভাবে বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজ করতে পারেন—এ বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

বিদ্যালয়ের হিসাব-নিকাশে অনিয়ম ও অডিট না হওয়ার অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন। তাঁর বক্তব্য, আগের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কাজ না করে থাকলে তার দায় তাঁর নয়।

সংকট দ্রুত সমাধানের আশ্বাস সিডিএ চেয়ারম্যানের:

চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন বলেন, সিডিএ স্কুলের প্রধান সমস্যা হলো শিক্ষক ও অভিভাবকদের দুটি পৃথক দলে বিভক্ত হয়ে পড়া। পরস্পরবিরোধী অবস্থানের কারণে একে অপরের পেছনে লেগে থাকার প্রবণতা প্রতিষ্ঠানের জন্য কল্যাণকর নয়। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায়।

বিদ্যালয়টির চলমান সংকট দূর করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, স্থানীয় সংসদ সদস্যকে সঙ্গে নিয়ে খুব শিগগিরই স্কুলের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে সভা করা হবে। উদ্ভূত সমস্যাগুলোর দ্রুত সমাধান করা হবে।




এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//








Advertisement
আরও খবর


Advertisement
Loading...
Loading...
সম্পাদক: শাহীন চৌধুরী
উপদেষ্টা সম্পাদক: হেলেনা বিলকিস চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: সৈয়দ আফজাল বাকের

অফিস: ২/১ হুমায়ুন রোড (কলেজ গেট) মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭ ফোন: ৮৮-০২-৪৮১১৯৪৯৫, হটলাইন: ০১৭১১-৫৮৩৬২৩, ০১৭১৭-০৯৮৪২৮
E-mail : [email protected], Web : www.abnews24bd.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, এবিনিউজ
সম্পাদক: শাহীন চৌধুরী
উপদেষ্টা সম্পাদক: হেলেনা বিলকিস চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: সৈয়দ আফজাল বাকের

অফিস: ২/১ হুমায়ুন রোড (কলেজ গেট) মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭ ফোন: ৮৮-০২-৪৮১১৯৪৯৫, হটলাইন: ০১৭১১-৫৮৩৬২৩, ০১৭১৭-০৯৮৪২৮
E-mail : [email protected], Web : www.abnews24bd.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, এবিনিউজ