চট্টগ্রাম নগরের খুলশী থানার লালখান বাজার এলাকায় প্রায় ৪৯ বছর আগে জলসা ক্লাবের অনুকূলে ইজারা দেওয়া সাড়ে আট শতাংশ জমি। যা বর্তমান বাজারমূল্য অন্তত ১০ কোটি টাকা। ইজারা প্রদানের শুরু থেকেই ওই জমিতে একটি এবাদতখানা রয়েছে। তবে উচ্চ আদালতে মামলা চলমান ও নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি রাতের আঁধারে সেখানে ঘর নির্মাণ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মামলার কোনো পক্ষ না হয়েও রফিকুল ইসলাম রফিক ও মোস্তাফিজুর রহমান সুমন গংয়ের নেতৃত্বে জমিটি দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করা হচ্ছে। উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা জারি থাকা অবস্থায় ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির পরও এই দখল কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
জানা গেছে, রফিকুল ইসলাম রফিক বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সদস্য ও মোস্তফিজুর রহমান ১৪ নম্বর লালখান বাজার ওয়ার্ডের বিএনপির সদস্য সচিব।
লালখান বাজার জলসা ক্লাব প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৬৫ সালে। একই স্থানে একটি এবাদতখানাও গড়ে ওঠে। ১৯৭৩ সালে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ক্লাবটি নিবন্ধন পায়। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালের ১ মার্চ ৮২(৭) নম্বর স্মারকে লালখান বাজার মৌজার বিএস দাগ নম্বর ৯৯০, ৯৯১ ও ৯৯২ ক্লাবের অনুকূলে ইজারা দেওয়া হয়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ক্লাবের একাধিক সদস্য সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। তাদের মধ্যে জাহাঙ্গীর চৌধুরী (সিএমসি) ও দেলোয়ার হোসেন হাজারী উল্লেখযোগ্য।
জানা গেছে, ক্লাবের অনুকূলে গেজেটভুক্ত বিক্রয়যোগ্য পরিত্যক্ত বাড়ি নম্বর ২৩১ ও ২৩২ নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে কম দামে বিক্রির আবেদন নিষ্পত্তি না হওয়া সত্ত্বেও ২০২০ সালের ৩০ নভেম্বর বিভাগীয় কমিশনার ও পরিত্যক্ত সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা বোর্ডের সভাপতি ১৬৯তম সভায় ওই জমি শহীদ পরিবারের অনুকূলে বরাদ্দ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে জলসা ক্লাবের পক্ষ থেকে হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন নম্বর ১০৭৮০/২০২১ দায়ের করা হয়। বর্তমানে মামলাটি চলমান এবং সংশ্লিষ্ট আদেশ বহাল রয়েছে।
স্বাধীনতার পর থেকে জলসা ক্লাব বিভিন্ন দুর্যোগে স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। বন্যা ও দুর্ভিক্ষ মোকাবিলায় সদস্যরা শ্রম ও সহায়তা দিয়েছেন। ২০১৯ সালের করোনাকালে ক্লাবের নিজস্ব তহবিল থেকে স্থানীয় ও আশপাশের এলাকায় খাদ্যসামগ্রী ও প্রয়োজনীয় ওষুধ বিতরণ করা হয়। দীর্ঘদিন ধরে যুব সমাজকে মাদক থেকে দূরে রাখতে প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের উদ্যোগও নেয় ক্লাবটি।
গত ১৩ জানুয়ারি চট্টগ্রামের গণপূর্ত রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুজ্জামান জিতু স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে সরকারি বিক্রয়যোগ্য পরিত্যক্ত বাড়ি নম্বর ২৩১ ও ২৩২-এর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগের জন্য চট্টগ্রাম জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আবেদন জানানো হয়।
ওই আদেশে বলা হয়, সরকারি কোটি টাকা মূল্যের সম্পত্তি রক্ষার্থে জরুরি ভিত্তিতে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে সম্পত্তিটি সরকারের দখলে আনা প্রয়োজন। বিষয়টিকে ‘অতীব জরুরি’ উল্লেখ করা হলেও এখনো দখল কার্যক্রম বন্ধ হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
এই বিষয়ে ক্লাবের সভাপতি মো. ইউনুস বলেন, উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে জলসা ক্লাবের ইজারাকৃত জমি দখলের চেষ্টা চলছে। প্রায় পাঁচ দশক ধরে ব্যবহৃত এই জমিতে একটি এবাদতখানাও রয়েছে। তিনি অবৈধ দখল বন্ধে দ্রুত প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ দাবি করেন।
রফিকুল ইসলাম রফিকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ক্লাবের জায়গার পাশেই তার নিজস্ব জমি রয়েছে। আমি কোনো দখল করেননি। আমি একজন প্রবাসি। এলাকার কিছু ব্যক্তি বিএনপির পরিচয়ে জায়গাটি নিয়ন্ত্রণ করছে। দীর্ঘদিন ধরে দুইজন প্রতারক অর্থ আদায়ের জন্য বিভিন্ন অপকর্ম চালিয়ে আসছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমার নিজস্ব জায়গাটি ব্যবহার করছি। সরকার চাইলে ছেড়ে দিতে প্রস্তুত আছি। তবে তার জায়গার পাশের অংশে কাউকে অবৈধভাবে কিছু করতে দিবনা। যারা অভিযোগ করেছে, তাদের নামে বর্তমানে জায়গাটির কোনো ইজারা নেই। আমার পাশের অংশটি ইজারা নেওয়ার জন্য আবেদনও করে রেখেছি।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//