Advertisement
বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট সময় এখন সামনে চলার
অরুণ কর্মকার
Publish: Thursday, 19 February, 2026, 8:50 PM

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচিত সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার পর আজই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে বিএনপি সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার প্রতি তাঁদের অঙ্গীকার এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের প্রকৃত সাংবিধানিক প্রক্রিয়া স্পষ্ট করেছে। এই প্রক্রিয়া সম্পর্কে বিশিষ্ট রাজনীতিবিজ্ঞানীও অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ এযাবতকাল যা বলে এসেছেন, যে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ জাতিকে শুনিয়েছেন বিএনপি শুরু থেকেই তার সঙ্গে দ্বিমত করে এসেছে। সেই দ্বিমতগুলোর অনেকটাই জুলাই সনদে নোট অফ ডিসেন্ট হিসেবে সংযুক্তও রয়েছে। কার্যক্ষেত্রে আজ বিএনপি যে অবস্থান নিয়েছে সেটাই সাংবিধানিক প্রক্রিয়া হিসেবে সঠিক না বলার গ্রহনযোগ্য কোনো যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না।


বিএনপি কখনোই বলেনি যে তাঁরা সংবিধান সংস্কারের পক্ষে নয়। বরং জুলাই অভ্যুত্থানের আগেই তাঁরা রাষ্ট্র সংস্কারের বিস্তারিত প্রস্তাব তৈরি করেছেন। অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের গঠিত সংস্কার পরিষদের সুদীর্ঘ অধ্যবসায়ে অংশ নিয়েও তাঁরা কাজ করেছেন। সব ক্ষেত্রেই বিএনপি সংসদীয় গণতন্ত্র এবং সঠিক সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি নিজেদের দৃঢ় অবস্থান বজায় রেখেছে। বিএনপি এ কথাও কখনো বলেনি যে, তাঁরা সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেবেন না। তাঁরা বলেছেন যে ওই শপথ নেওয়ার জন্য সংসদীয় গণতন্ত্রের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সেই অবস্থানে যেতে হবে।


একথা কেউই অস্বীকার করতে পারেন না যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নির্বাচনে কেউই সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হননি। কিন্তু তাঁদের ওপর সংবিধান সংস্কারের একটি বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে গণভোট। তাঁরা সেটা মানবেন। সেজন্য যে প্রক্রিয়াটা অনুসরণ করতে হবে তা হলো-গণভোটের রায় অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি এবং এই পরিষদকে কে শপথ পড়াবেন সেই বিধান আগে সংবিধানে ধারণ করতে হবে। সেজন্য এই বিষয়গুলো সংবিধানের তৃতীয় তফসিলে আসবে। সেগুলো সাংবিধানিকভাবে সংসদে গৃহীত হওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ নেওয়ার বিধান করতে হবে। কাজেই আগে জাতীয় সংসদের অধিবেশন বসতে হবে।


অধ্যাপক ড. আলী রিয়াজসহ যারা যুক্তি দেন যে জুলাই অভ্যুত্থানের গণরায় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর অনেক বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, তাঁরা অভ্যুত্থানের পর অণ্তর্বর্তী সরকার গঠন, রাষ্ট্রপতির কাছে সেই সরকারের শপথ গ্রহণ থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সকল ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বিধান অনুযায়ী সকল রাষ্ট্রীয় কাজ পরিচালনা করে এসেছেন। সুতরাং আজ এসে কীভাবে এটা গ্রহনযোগ্য হতে পারে যে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে, আগেই প্রধান নির্বাচন কমিশনারের কাছে শপথ নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করা যায়! প্রধান নির্বাচন কমিশনার কোন বিধান অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ পড়াবেন। তিনি যে সংসদ সদস্যদের শপথ পড়িয়েছেন তাও তো সংবিধানের বিধান অনুযায়ী। তাহলে এক্ষেত্রে কীভাবে তার ব্যাত্যয় ঘটানো যায়?


জামায়াতে ইসলামী এবং সর্বশেষ এনসিপির পক্ষ থেকেও বলা হয়েছিল যে বিএনপি সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিলে তাঁরা কোনা শপথই নেবেন না। শেষ পর্যন্ত তাঁরা সেই অবস্থান সরে এসে সংসদ সদস্য হিসেবে এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদেরও শপথ নিয়েছেন।দেশবাসীর প্রত্যাশা-প্রতিটি রাজনৈতিক দল, সরকার ও বিরোধীদল নির্বিশেষে সবাই সংসদীয় সরকার ব্যবস্থার সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে দেশের গণতান্ত্রিক শাসনকাঠামো মজবুত করে তুলতে ভূমিকা রাখবেন। সবাইকেই মনে রাখতে হবে যে, এখন সময় আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার।
 
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ-অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা গ্রহন, তাঁদের কাজকর্ম-সংস্কার, বিচার, জুলাই সনদ প্রণয়ণ, সর্বোপরি ত্রয়োদশ সংসদের নির্বাচন ও সাংবিধানিক সংস্কারের প্রশ্নে গণভোট অনুষ্ঠান, এই সবকিছুই হয়েছে জাতীয়ভাবে আমাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়ে। কিন্তু সেই এগিয়ে যাওয়ার পথে অনেক প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। এর কিছু কিছু আগে থেকেই বিদ্যমান ছিল। আর কিছু নতুন করে গত দেড় বছরে সৃষ্টি হয়েছে। এর সবগুলোই মোকাবেলা করতে হবে নতুন সরকারকে এবং মোকাবেলা না করে এগিয়ে যাওয়ার উপায় নাই। আর বিরোধী দলকে হতে হবে সরকারের যৌক্তিক সমালোচক-সহযোগী।

এবার নিরংকুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠন করেছে বিএনপি।শুরুতেই নতুন সরকারকে যে প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হবে তা হলো পবিত্র রমজান এবং বোরো মৌসুমে গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট। দেশে বিদ্যুতের উৎপাদন সক্ষমতা চাহিদার তুলনায় কিছু বেশি থাকলেও প্রয়োজনীয় জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাস সরবরাহে ঘাটতি থাকায় উতপাদন কম করতে হয়। আবার গ্যাসের ঘাটতি থাকায় তেলভিত্তিক বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোর ওপর বেশি নির্ভর করতে হয়। অথচ অন্তর্বর্তী সরকার তেলভিত্তিক বেসরকারি বিদ্যুতকেন্দ্রগুলোর প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বিল বাকি রাখায় ঐ কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুত উতপাদনে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
 
অন্তর্বর্তী সরকার প্রথমে ওই কেন্দ্রগুলোর বেশ কিছু বকেয়া পাওয়া পরিশোধ করলেও পরে যখন নির্বাচনের পথযাত্রা শুরু হয়ে যায় তখন থেকে বিল পরিশোধ বন্ধ করে দেয়। ফলে কেন্দ্রগুলোর জন্য জ্বালানি তেল আমদানি অসম্ভব হয়ে পড়ে। রমজান এবং বোরো মৌসুমে এই কেন্দ্রগুলোই হবে বিদ্যুত পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখার প্রধান ভরসাকেন্দ্র। অন্তর্বর্তী সরকার ৩২ নিলিয়ন ডলারের রিজার্ভ গড়ে গড়ার সাফল্য দেখানো চেয়ে যদি এক বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ কম রেখে এই দেনা-পাওনাগুলো পরিশোধ করতো তাহলে নতুন সরকারের জন্য সুবিধা হতো। নতুন সরকারকে এলএনজি আমদানিও অব্যাহত রাখতে হবে সর্বোচ্চ সক্ষমতায়। আর্থিক দিক দিয়ে সেটিও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

দ্বিতীয় যে প্রতিবন্ধকতা মোকাবেলা করতে হবে তা হলো, গত দেড় বছরে বন্ধ হয়ে যাওয়া বিভিন্ন খাতের কয়েক হাজার শিল্প-কারখানা চালু করা। এগুলো বন্ধ হওয়ায় বেকার হয়ে পড়া কয়েক লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থানের আর কোনো সহজ পথ নেই। বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারে অবশ্য বন্ধ কলকারখানা চালুর পদক্ষেপ গ্রহন এবং রপ্তানি খাতে বৈচিত্র্য আনার অঙ্গীকার করা হয়েছে। তাই এই কাজটি অগ্রাধিকার পাবে বলেই ধারণা করা যায়। 


তৃতীয় যে প্রতিবন্ধকতাটি মোকাবেলা করতে হবে তা হলো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক ও সামাজিক দায়ভার। অর্থনৈতিক দায়ভারের মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বছরে ১৫ বিলিয়ন ডলারের জ্বালানি আমদানি এবং পর্যায়ক্রমে বিমান প্রভৃতি কেনা। আর যে বিষয়টি এই বিষয়টি এই চুক্তিতে রয়েছে-যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন ধরণের কৃষিপণ্য আমদানি এবং সেগুলোকে বিশেষ শুল্কসুবিধা দেওয়া, এর যেমন আর্থিক দায়ভার রয়েছে তেমনি রয়েছে সামাকিত দায়ভারও। কারণ এর ফলে দেশের কৃষকদের উতপাদিত পন্যসামগ্রী বাড়তি প্রতিযোগিতার মধ্যে পড়বে। দীর্ঘমেয়াদে তাঁদের আর্থিক অবস্থার অবনতি ঘটবে। দেশে কৃষিজাত পন্যের দাম বাড়বে। সেই বাড়তি দামের বোঝা বহন করতে হবে সর্বসাধারণকে যাদের মধ্যে নিম্ন-মধ্য ও সীমিত আয়ের মানুষের সংখ্যা অনেক। 

চতুর্থ বিষয়টি হলো-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা চুক্তির শর্ত হিসেবে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সীমিত করতে হবে। এছাড়া অন্তর্বর্তী সরকার শেষ সময়ে চট্টগ্রাম বন্দরের একটি অংশ ডিপি ওয়ার্ল্ড নামক একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে লিজ দেওয়ার যে প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করে এনেছিল সে বিষয়েও নতুন সরকারকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

পঞ্চম বিষয় হলো-অন্তর্বর্তী সরকার তার মেয়াদের একেবারে শেষে এসে তড়িঘড়ি করে সাড়ে ১৪ লাখ প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ দিয়েছে। কিন্তু তাঁদের বেতন-ভাতার কোনো সংস্থান করেনি। এই কাজটিও নতুন সরকারকে করতে হবে। একইভাবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য যে প্রে-স্কেল চূড়ান্ত করে রেখে গেছে তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও পড়বে নতুন সরকারের ওপর। এগুলোর আর্থিক দায় হবে বিপুল পরিমান। অথচ সরকারের অর্থসংকট প্রকট। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় খেলাপি ঋণ উসুল হওয়ার পরিবর্তে তা পরিমান আরো বিপুল পরিমান বেড়েছে। শুধু তাই নয়, এই সময়ে সরকারি ঋণের পরিমানও বেড়েছে বিপুল পরিমানে।

এছাড়া দ্রব্যমূল্য স্থিতিশীল রাখা, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য কমিয়ে আনা, সর্বোপরি দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মতো জরুরি কাজেও শুরু থেকেই নতুন সরকারকে গভীর মনোনিবেশ করতে হবে। এগুলোর মধ্যে কোনো কাজই যেমন সহজ নয় তেমনি তা না করেও সামনে অগ্রসসর হওয়া সম্ভব হবে না। কিন্তু সামনে এগুতেই হবে। নতুন এক রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সরকারের ওপর জাতি এই গুরুদায়িত্ব অর্পন করেছে। যদিও পথ বন্ধুর। কিন্তু সময় এখন সামনে এগিয়ে যাওয়ার।




এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//






Advertisement


Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
চট্টগ্রামকে বিলবোর্ডমুক্ত করার ঘোষণা: কাজীর দেউরীতে উচ্ছেদ অভিযানে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন
গণভোটের ‘হ্যাঁ’—এর জন্য শপথের কোনো প্রয়োজন নেই: পানিসম্পদ মন্ত্রী
সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে কবে, জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
গোপনে মবকে প্রশ্রয় দেওয়া ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হবে: তথ্যমন্ত্রী
গোপনে মবকে প্রশ্রয় দেওয়া ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হবে: তথ্যমন্ত্রী
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
ওয়াসায় কক্ষ বরাদ্দ নিয়ে বিভ্রান্তি, সংগঠনের প্রতিবাদ
মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ
শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন ববি হাজ্জাজ
৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করছে বিএনপি, ডাক পেলেন যারা
বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট সময় এখন সামনে চলার
সম্পাদক: শাহীন চৌধুরী
উপদেষ্টা সম্পাদক: হেলেনা বিলকিস চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: সৈয়দ আফজাল বাকের

অফিস: ২/১ হুমায়ুন রোড (কলেজ গেট) মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭ ফোন: ৮৮-০২-৪৮১১৯৪৯৫, হটলাইন: ০১৭১১-৫৮৩৬২৩, ০১৭১৭-০৯৮৪২৮
E-mail : abnews13@gmail.com, Web : www.abnews24bd.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, এবিনিউজ