বাংলাদেশ রেলওয়ের বিভিন্ন ট্রেনের অনবোর্ড ও ক্যাটারিং সেবায় নিয়োজিত কর্মীদের বেতন, নিয়োগ এবং দায়িত্ব পালনে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এস এ কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহ আলমের বিরুদ্ধেও কর্মী নিয়োগে অর্থ আদায়, কর্মীদের কাছ থেকে ডিউটি দেওয়ার বিনিময়ে টাকা নেওয়া এবং রেলওয়ের বিভিন্ন সেবায় প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন কর্মী, ভুক্তভোগী ও ঠিকাদার।
তবে এসব অভিযোগের সবকটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। অভিযোগের বিষয়ে শাহ আলমের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে। তিনি অনবোর্ড কর্মীদের বেতন না পাওয়ার অভিযোগের বিষয়ে সরাসরি দায় স্বীকার করেননি এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পরে কথা বলার কথা জানান।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জনবল সংকটের কারণে অনবোর্ড সেবায় ঠিকাদারের মাধ্যমে ম্যানেজার, স্টুয়ার্ড, পিএ অপারেটর ও ক্লিনারসহ বিভিন্ন পদে লোক নিয়োগ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, এসব কর্মীর জন্য রেলওয়ে নিয়মিত অর্থ বরাদ্দ দিলেও কর্মীদের অনেকে সেই অর্থ পুরোপুরি পান না।
সংশ্লিষ্ট কর্মীদের দাবি, ক্লিনার পদে মাসিক প্রায় ১৭ হাজার ৫০০ টাকা এবং ম্যানেজার পদে প্রায় ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন কাঠামো রয়েছে। অন্যান্য পদেও নির্ধারিত বেতন রয়েছে। পাঁচটি ট্রেনের অনবোর্ড কর্মীদের জন্য মাসে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বেতন বরাদ্দ দেওয়া হয় বলে তাদের দাবি।
যেসব ট্রেনের নাম এসেছে সেগুলো হলো—সুবর্ণ এক্সপ্রেস, গোধূলী এক্সপ্রেস, মহানগর এক্সপ্রেস, কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও মোহনগঞ্জ এক্সপ্রেস।
বেতন না পাওয়ার অভিযোগ
অনবোর্ডে কর্মরত কয়েকজনের অভিযোগ, রেলওয়ে থেকে কর্মীদের নামে অর্থ বরাদ্দ হলেও তারা নিয়মিত বেতন পান না। বরং ডিউটি করার জন্যও তাদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেছেন তারা।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের কমার্শিয়াল বিভাগের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, নিয়োগের সময় অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। নিয়োগ পাওয়ার পরও অনেক কর্মীকে নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি এবং নিয়মিত বেতনও দেওয়া হয় না বলে তিনি দাবি করেন।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ডিউটি পাওয়ার জন্য কর্মীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাঁর দাবি, নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি কর্মী অনবোর্ডে নিয়োজিত থাকায় বিষয়টি টেন্ডারের শর্তের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
এস এ কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে শুধু অনবোর্ড বা ক্যাটারিং নয়, রেলওয়ের বিভিন্ন টেন্ডার ও ঠিকাদারি কাজ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন ঠিকাদার।
তাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে রেলওয়ের বিভিন্ন বিভাগের কাজের বড় একটি অংশ একই প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আদালতের আদেশসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি টেন্ডার ধরে রাখে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
ঠিকাদার নাছির উদ্দিন মোহনের দাবি, তিনি ও শাহ আলম প্রায় একই সময়ে রেলওয়েতে ঠিকাদারি শুরু করলেও বর্তমানে শাহ আলমের ব্যবসায়িক অবস্থান অনেক বেশি শক্তিশালী। তাঁর অভিযোগ, শাহ আলমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ থাকলেও প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় তিনি কাজ পেয়ে যাচ্ছেন।
শাহ আলমের বক্তব্য:
অভিযোগের বিষয়ে জানতে এস এ কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী মোহাম্মদ শাহ আলমের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়। ফোনে কথা না হলেও মেসেঞ্জারে পাঠানো প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অপরাধে জড়িত ব্যক্তির দায় প্রতিষ্ঠান নেবে কেন? তাঁর দাবি, অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।
অনবোর্ড ও ক্যাটারিং কর্মীদের বেতন না পাওয়া এবং ডিউটি পেতে টাকা দেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে শাহ আলম জানান, তিনি ঢাকায় যাচ্ছেন এবং পরে এ বিষয়ে বসে কথা বলবেন।
রেলওয়ের বক্তব্য:
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোছাম্মৎ কামরুন্নেছার কাছে অনবোর্ড কর্মীদের নিয়োগ ও বেতন সংক্রান্ত তথ্য জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তাঁর কাছে তথ্য নেই এবং কমার্শিয়াল চিফের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
রেলের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ট্রেনে মাদক পাচার বা ধর্ষণের মতো ঘটনায় রেলের নিরাপত্তা ও ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে—এটি অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে সংশ্লিষ্টরা রেলের স্থায়ী কর্মী নন; তারা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ করা কর্মী।
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিকও এসব অপরাধের সঙ্গে জড়িত কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিষয়টি তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন। এস এ কর্পোরেশনের মালিকের বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজি ও দখলবাজির অভিযোগের বিষয়ে তিনি রেলের অপারেশন বিভাগের অতিরিক্ত মহাপরিচালকের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক সঞ্জিত কুমার বিশ্বাস ও অতিরিক্ত প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক মো. শওকত জামিল মোহসীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ফলে এস এ কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে ওঠা বেতন আত্মসাৎ, নিয়োগ-বাণিজ্য, রাজস্ব ফাঁকি ও টেন্ডার অনিয়মের অভিযোগগুলো তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা এবং রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর অবস্থান নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//