চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড-কে ইজারা দেওয়ার উদ্যোগের প্রতিবাদে বিক্ষোভ মিছিল করেছে ‘বন্দর রক্ষা কমিটি’। একই সঙ্গে আগামী ৫ অক্টোবর বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) বন্দর রক্ষা কমিটির উদ্যোগে নগরীর বারিক বিল্ডিং এলাকা থেকে মিছিলটি বের হয়। পরে বন্দর অভিমুখে এগিয়ে দুই নম্বর গেটের সামনে পৌঁছালে পুলিশের অনুরোধে কর্মসূচি শেষ করেন আন্দোলনকারীরা।
সমাবেশে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের নেতারা বক্তব্য রাখতে গিয়ে বলেন, এনসিটি এবং সিসিটি দেশের কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ এবং দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে এগুলো কোনো বিদেশি অপারেটরের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়।
ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র (টিইউসি)-এর চট্টগ্রাম জেলা কমিটির সভাপতি তপন দত্ত বলেন, চট্টগ্রাম বন্দর হলো বাংলাদেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। তিনি বলেন, ‘বন্দরের গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালগুলোকে কোনো বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়া কখনোই জাতীয় স্বার্থের অনুকূল হতে পারে না।’
তিনি আরও বলেন, টার্মিনালগুলো ইজারা দেওয়ার যেকোনো সিদ্ধান্তে জাতীয় স্বার্থ, শ্রমিকদের অধিকার এবং জাতীয় নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া উচিত। তপন দত্ত বলেন, ‘বন্দরের সম্পদ ও অবকাঠামো জনগণের সম্পত্তি। দীর্ঘমেয়াদি ইজারার মাধ্যমে বিদেশি কোম্পানির কাছে এ ধরনের জাতীয় সম্পদ হস্তান্তর করার যেকোনো চেষ্টার বিরুদ্ধে শ্রমিক ও জনগণকে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।’
জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের চট্টগ্রাম বিভাগীয় কমিটির সভাপতি এএম নাজিম উদ্দিন বলেন, ‘বন্দর কেবল একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নয়; এটি দেশের অর্থনীতি, জাতীয় স্বার্থ ও সার্বভৌমত্বের সাথে জড়িত একটি কৌশলগত স্থাপনা।’
তিনি বলেন, ‘টার্মিনাল পরিচালনার নামে কোনো বিদেশি কোম্পানিকে এনসিটি ও সিসিটির ওপর দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ দেওয়া হলে ভবিষ্যতে তার মারাত্মক বিরূপ পরিণতি হতে পারে।’ তিনি বন্দর ব্যবস্থাপনায় অধিকতর স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার দাবি জানান এবং ইজারার এই প্রস্তাবটি পুনর্বিবেচনা করার জন্য সরকারের প্রতি জোর আহ্বান জানান।
শ্রমিক নেতা কাজী শেখ নূরুল্লাহ বাহার বলেন, জনগণের স্বার্থে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্ত যদি দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের পরিপন্থী হয়, তবে তা বাস্তবায়ন করা যাবে না। গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোগুলো বিদেশি অপারেটরদের হাতে তুলে দেওয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত বন্দর কর্তৃপক্ষের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির সংযোজন এবং দক্ষ কর্মী নিয়োগের ওপর জোর দেওয়া।
তিনি আরও দাবি করেন যে টার্মিনালগুলো ইজারা দিলে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হতে পারে এবং বন্দর শ্রমিকদের চাকরি, কর্মসংস্থানের নিরাপত্তা ও অধিকার নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা পরিষদের আহ্বায়ক দেলোয়ার মজুমদার এনসিটি এবং সিসিটিকে দেশের জন্য প্রচুর সুবিধা বয়ে আনা ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁস’ বলে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, ‘একটি বিশেষ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী পুরো হাঁসটিকেই গিলে ফেলার চেষ্টা করছে। জাতীয় স্বার্থে আমরা এ ধরনের কোনো উদ্যোগ কিছুতেই মেনে নেব না।’ তিনি জানান, পরিষদ শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মাধ্যমে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছিল, কিন্তু সরকারের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
দেলোয়ার মজুমদার বলেন, ‘আমরা রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছি। এই আন্দোলন দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ার আগেই সরকারকে ঘোষণা দিতে হবে যে এনসিটি ও সিসিটি ইজারা দেওয়া হবে না।’
সমাবেশ শেষে বিক্ষোভকারীরা ইজারা প্রস্তাব বাতিল এবং চট্টগ্রাম বন্দরের স্বার্থ রক্ষার দাবিতে স্লোগান দিতে দিতে বন্দরের দিকে পদযাত্রা করেন। পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে আগামী ৫ অক্টোবর চট্টগ্রাম বন্দর ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি ঘোষণা করেছে তারা।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//