বাংলাদেশের গণমাধ্যম খাতের অর্থবহ সংস্কার প্রক্রিয়া থমকে আছে। পেশাগত মানদণ্ড আরও শক্তিশালী করা এবং একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে ব্যাপক ঐকমত্য থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে কাঠামোগত দুর্বলতা ও জনআস্থার ক্রমহ্রাসমান পরিস্থিতির মধ্যে তরুণ সাংবাদিকদের কাজ করতে হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বক্তারা।
ঢাকার একটি হোটেলে আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ‘বাংলাদেশে সংস্কার কর্মসূচিতে তরুণদের কার্যকর সম্পৃক্ততা’ (JoYEE) প্রকল্পের আওতায় ভয়েসেস ফর ইন্টারঅ্যাকটিভ চয়েস অ্যান্ড এমপাওয়ারমেন্ট (VOICE) এবং দ্য বাংলাদেশ ডায়ালগ (TBD) যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সুশাসন ও সংস্কার প্রক্রিয়ায় তরুণদের অর্থবহ অংশগ্রহণ জোরদার করাই এ প্রকল্পের লক্ষ্য। এ লক্ষ্যে জবাবদিহি, স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক উন্নয়ন বিষয়ে আলোচনায় তরুণদের মতামত তুলে ধরার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে।
গোলটেবিল আলোচনায় তরুণ প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন। দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার মাধ্যমে তরুণদের উদ্বেগ ও প্রত্যাশা কীভাবে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরা যায়, জনপরিসরের বিতর্কে তাদের কণ্ঠস্বর কীভাবে জোরালো করা যায় এবং নাগরিক ও নীতিনির্ধারণী আলোচনায় তাদের অংশগ্রহণ কীভাবে বাড়ানো যায়—এসব বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বক্তারা বলেন, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক তরুণ ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী দেশের জনমিতিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন এগিয়ে নেওয়ার বড় সুযোগ তৈরি করেছে। তবে তরুণদের কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত ও কাজে লাগাতে ব্যর্থ হলে দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে নানা চ্যালেঞ্জ তৈরি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন VOICE-এর নির্বাহী পরিচালক আহমেদ স্বপন মাহমুদ।
তিনি বলেন, সংস্কার নিয়ে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা যেন জনআলোচনার অংশ হয়ে থাকে, তা নিশ্চিত করাই এ গোলটেবিল আলোচনার অন্যতম উদ্দেশ্য। তরুণদের মতামত ও কণ্ঠস্বর গণমাধ্যমে আরও যথাযথভাবে তুলে ধরার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। আলোচনায় উঠে আসা মতামত ও সুপারিশের ভিত্তিতে একটি নীতিপত্র তৈরি করে সুশাসন ও তরুণদের অংশগ্রহণের বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে বলেও জানান তিনি।
দ্য ডেইলি স্টারের কনসালটিং এডিটর কামাল আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তরুণ সাংবাদিকদের আকৃষ্ট করা নয়, বরং তাদের পেশায় ধরে রাখা। সীমিত ক্যারিয়ার সম্ভাবনা এবং খাতটির গভীর কাঠামোগত সমস্যার কারণে অনেক তরুণ কয়েক বছরের মধ্যেই সাংবাদিকতা পেশা ছেড়ে দেন।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনেরও আগে থেকেই গণমাধ্যম খাতে সংকট ছিল। মালিকানার ধরন, বিনিয়োগ কাঠামো ও সম্পাদকীয় প্রভাবের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন না আসায় সেই সংকট অব্যাহত রয়েছে।
অনলাইনে ক্রমবর্ধমান সংখ্যক সংবাদমাধ্যম পেশাদার সাংবাদিকতার পরিবর্তে ক্লিক ও ট্রাফিক বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
তিনি বলেন, গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের প্রস্তাবিত স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠন এবং পুরো খাতের জন্য নৈতিক নির্দেশিকা প্রণয়নসহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের ব্যাপারে ব্যাপক সমর্থন থাকলেও এখনো সেগুলো বাস্তবায়িত হয়নি।
তিনি আরও বলেন, “প্রাণবন্ত গণতন্ত্রের জন্য প্রাণবন্ত গণমাধ্যম প্রয়োজন। তাই তরুণদের সংস্কারের দাবি অব্যাহত রাখতে হবে এবং গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের কাছ থেকে জবাবদিহি ও দায়িত্বশীলতা দাবি করতে হবে।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু)-এর সদস্য ও ছাত্র অধিকারকর্মী হেমা চাকমা বলেন, জনমত গঠনে গণমাধ্যমে কোনো বিষয়কে কীভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলো অনেক সময় পর্যাপ্ত যাচাই-বাছাই ছাড়াই এমন কিছু বয়ান তৈরি করে, যা পরবর্তী সময়ে অন্য গণমাধ্যমও অনুসরণ করে।
সাজেকে যাওয়ার পথে এক গর্ভবতী নারীর মৃত্যুর সংবাদ পরিবেশনের প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ওই ঘটনার পেছনের প্রেক্ষাপট পুরোপুরি উপেক্ষা করা হয়েছিল। পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ে গণমাধ্যমের সংবাদ পরিবেশন নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পেজ ও ক্লিকবেইট কনটেন্টের মাধ্যমে ভুল তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায়ও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তরুণরা আশা করেন, গণমাধ্যম যথাযথ তথ্যনির্ভরতা, নিরপেক্ষতা ও নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখবে এবং একই সঙ্গে বিভিন্ন শ্রেণি ও মতের মানুষের কণ্ঠস্বর তুলে ধরে সচেতন জনআলোচনা গড়ে তুলবে।
অংশগ্রহণকারীরা বলেন, তরুণদের কণ্ঠস্বরকে বৃহত্তর জন আলোচনা ও গণতান্ত্রিক সংস্কার কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত করতে গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্তর্ভুক্তিমূলক ও দায়িত্বশীল সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে তরুণদের মতামতের দৃশ্যমানতা বাড়ানো, সচেতন নাগরিক অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা এবং সুশাসন প্রক্রিয়ায় তরুণদের সম্পৃক্ততা আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
তারা আরও বলেন, তরুণদের বিভিন্ন নেটওয়ার্ক ও গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করা গেলে জনআলোচনার কেবল ‘বিষয়’ হিসেবে নয়, বরং গণতান্ত্রিক সংলাপ ও সংস্কার প্রক্রিয়ার সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে তরুণদের ভূমিকা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।
গোলটেবিল আলোচনার শেষে নাগরিক, গণমাধ্যম ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তথ্যপ্রবাহ আরও শক্তিশালী করতে এবং জন আলোচনা ও সংস্কার-সংক্রান্ত আলোচনায় তরুণদের মতামত যথাযথভাবে প্রতিফলিত করতে তরুণ সংগঠন ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে অব্যাহত সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//