জিটুজি (Government to Government) পদ্ধতিতে সার আমদানির নামে শত শত কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ উঠেছে। দেশ-বিদেশে এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা চলছে। সম্প্রতি থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে অনুষ্ঠিত ইফা কনফারেন্সে বিভিন্ন দেশের সার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান ও ট্রেডিং কোম্পানির প্রতিনিধিদের উপস্থিতিতে এই অভিযোগ বিষয়টি বিশেষভাবে আলোচিত হয়।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন (বিএডিসি) রাষ্ট্রীয় চুক্তির আওতায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট দেশের সরকারি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সার আমদানি করার কথা। কিন্তু সেই নিয়ম উপেক্ষা করে চীনের বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেড-এর সঙ্গে চুক্তি করে নিম্নমানের সার আমদানি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চীনের ইউয়া ও শ্যাং ফ্যাং নামক দুটি বেসরকারি কারখানা থেকে নিম্নমানের ডাই-অ্যামোনিয়াম ফসফেট (ডিএপি) সার আমদানি করা হচ্ছে। বিএডিসির এলসি (Letter of Credit) নীতিমালা উপেক্ষা করে বানিয়া ইন্টারন্যাশনাল ট্রেডিং লিমিটেড সরকারকে উচ্চমূল্যে নিম্নমানের সার সরবরাহ করছে।
এলসিতে উল্লেখ রয়েছে, প্রতি মেট্রিক টন ডিএপি সারে ১৮% নাইট্রোজেন এবং ৪৬% ফসফেটসহ মোট ৬৪% উপাদান থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, ৫০% থেকে ৫৭% মানের ডিএপি সার মিশিয়ে জাহাজীকরণ করা হচ্ছে। এতে প্রতিমেট্রিক টনে ৯৫ থেকে ১০০ মার্কিন ডলার অতিরিক্ত বিল দেখিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার হচ্ছে।
অভিযোগে আরও জানা যায়, প্রতিটি ৪০ হাজার মেট্রিক টন সারবাহী জাহাজে ১৪ থেকে ১৫ হাজার মেট্রিক টন নিম্নমানের সার রাতের অন্ধকারে মিশ্রিত করা হয়। এতে বাংলাদেশের কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে।
এই অনিয়মের সহায়ক ভূমিকা পালন করছে কন্টিনেন্টাল ইন্সপেকশন কোং (বিডি) লিমিটেড নামক একটি স্থানীয় প্রতিষ্ঠান। রাজধানীর বাড্ডায় অবস্থিত এই কোম্পানিকে এলসির ইন্সপেকশন সংস্থা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, যদিও সাধারণত আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত প্রতিষ্ঠান—এসজিএস বা ইন্সপেক্টরেট—এই দায়িত্ব পালন করে থাকে। স্থানীয় এই প্রতিষ্ঠান সারের গুণগতমান যাচাই ছাড়াই সার্টিফিকেট ইস্যু করছে, যার ভিত্তিতে বিদেশি কোম্পানি ব্যাংক থেকে বিল আদায় করছে।
সূত্র মতে, কন্টিনেন্টাল ইন্সপেকশন কোং (বিডি) লিমিটেডের মালিক মোহাম্মদ উল্লাহ, যিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএডিসি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখে এলসির মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচারে যুক্ত রয়েছেন। তার মালয়েশিয়া-ভিত্তিক ব্যবসায়িক পার্টনার হিসেবে রয়েছেন সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের জামাতা পরিচয়দানকারী মো. সাব্বির হোসেন, যিনি মালয়েশিয়া থেকে এই কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন।
বিএডিসির পরিবর্তে ইন্সপেকশন কোম্পানির বিল সরাসরি সরকারিভাবে পরিশোধ করা হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এতে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও বিদেশে অর্থ পাচারের নতুন এক চক্র সক্রিয় হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক প্রতি মাসে এলসি অডিট করলেও, এই অনিয়ম কীভাবে তাদের নজর এড়িয়ে চলছে তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের নিম্নমানের সার আমদানিতে দেশের ১৩ কোটি প্রান্তিক কৃষক সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এবং মাটির উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে।
এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম/এফ//