Advertisement
শেষ পর্যন্ত আদানিই গেল আন্তর্জাতিক আদালতে
বিশেষ প্রতিনিধি
Publish: Saturday, 7 February, 2026, 12:40 AM Update: 07.02.2026 12:44 AM

ভারতীয় কোম্পানি আদানি পাওয়ারের সঙ্গে বিগত সরকারের সম্পাদিত বিদ্যুত চুক্তিটি বহুল সমালোচিত ও একটি অসম চুক্তি হিসেবে কুখ্যাত। এই চুক্তি বাতিল করা চব্বিশের অভ্যুত্থানের একটি জোরালো দাবি ছিল। এছাড়া আরো অনেক চুক্তির মাধ্যমে বিগত সরকার ছোট বড় প্রায় অর্ধশত বিদ্যুতকেন্দ্র স্থাপন করেছে। ২০১০ সালে ওই সরকারেরই প্রণীত ‘বিদ্যুত ও জ্বালানির বিশেষ সরবরাহ আইন’-এর অধীনে করা এসব চুক্তি নিয়েই সমালোচনা প্রচুর। আছে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগও।

 
সেই সরকারের বিদায়ের পর অন্তর্বর্তী সরকার এসব বিদ্যুত চুক্তি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার জন্য অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করেছিল। এই কমিটি আদানিসহ অন্তত: ১০টি চুক্তি বিস্তারিতভাবে পর্যালোচনা করেছে। তাতে চুক্তি সম্পাদনায় অসমতা এবং দুর্নীতির স্পষ্ট প্রমান তাঁরা পেয়েছেন বলে বলা হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও আদানির সঙ্গে চুক্তিটি বাতিল করা হয়নি। এখন উল্টো আদানিই চুক্তি অনুযায়ী কয়লার মূল্য নির্ধারণ ও
বিদু‌্যতের দাম নিয়ে আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।
 
জাতীয় পর্যালোচনা কমিটির প্রধান বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী গত মঙ্গলবার এক আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে আদানির সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিটির প্রসঙ্গে বলেছেন, চুক্তিটি স্বেচ্ছাচারি এবং অপ্রতিযোগিতামূলকভাবে অনুমোদিত হয়েছিল, যেখানে জ্বালানির মূল্য, মুদ্রার বিনিময় হার, শুল্ক ও কর, নীতি পরিবর্তন প্রভৃতি সমস্ত ঝুঁকি পড়েছিল বাংলাদেশ বিদ্যু উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) ওপর। অন্যান্য প্রকল্পের ক্ষেত্রেও এমনটাই লক্ষ্য করা গেছে, যার অর্থনৈতিক প্রভাব হয়েছে গুরুতর।

বিষয়গুলো আরো স্পষ্ট করে বলেছেন ওই কমিটির সদস্য এবং স্কুল অফ ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিস (সোয়াস) ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডনের  অর্থনীতির অধ্যাপক মুশতাক হোসাইন খান। ওই আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বিদ্যূত সরবরাহের জন্য আদানি বিদ্যুতকেন্দ্র করেছে ঝাড়খন্ডে। ভারতের ওই রাজ্যটি কয়লার জন্যই বিখ্যাত। এর সর্বত্রই কয়লা। অথচ ওই বিদ্যুতকেন্দ্রটির জন্য আদানি কয়লা আমদানি করছে অস্ট্রেলিয়া থেকে। সেই কয়লা গুজরাটে কোনো এক বন্দরে আসার পর সেখান থেকে ট্রেনে করে আনা হচ্ছে ঝাড়খন্ডে। চুক্তিগুলো পরীক্ষা করে তাঁরা দেখেছেন, কোনো একটি চুক্তি যেদিন স্বাক্ষরিত হয়েছে তার পরপরই যিনি বা যারা এই স্বাক্ষর করেছেন তাঁরা বিদেশ সফরে গেছেন। চুক্তি স্বাক্ষরের তারিখ এবং তাঁদের বিদেশ সফরের তারিখগুলো পরীক্ষা করে এই প্রমাণ পাওয়া গেছে। 

তিনি বলেন, যে সব দেশে তাঁরা সফরে গেছেন সেখানে বিশেষ বিশেষ সূত্রের মাধ্যমে খোঁজ নিয়ে তাঁরা জানতে পেরেছেন যে ওই সব দেশে সংশ্লিষ্ট সফরকারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট রয়েছে এবং সফরকালেই তাঁদের সে সব অ্যাকাউন্টে বিপুল অংকের অর্থ জমা হয়েছে। এই যে যোগসূত্রটি পাওয়া গেছে, তাতে এটা স্পষ্ট যে ওই বিদ্যুতচুক্তিগুলো সম্পাদনে ব্যাপক দুর্নীতি হয়েছে। এই দুর্নীতির কারনেই বিগত সরকারের সময়কালে বিদ্যুত উৎপাদন চারগুন বাড়লেও খরচ বেড়েছে ১১গুন। আর ক্যাপাসিটি চার্জ বেড়েছে প্রায় ২০গুন। ফলে বিদ্যুত ও জ্বালানি খাতে সংকট সৃষ্টি হয়েছে। গত বছর বিদ্যুত খাতে পাঁচ বিলিয়ন (৫০০ কোটি) মার্কিন ডলার ভর্তুকি দিতে হয়েছে। ভর্তুকি তুলে নিতে হলে বিদ্যুতের দাম বাড়াতে হবে ৮৬ শতাংশ। তাতে দেশে কোনো শিল্প টিকবে না। আবার এত বিপুল অংকের ভর্তুকি দিয়েও এই খাত টিকতে পারবে না।

এখন প্রশ্ন হলো-দুর্নীতির প্রমানগুলো যখন এতটা স্পষ্টভাবেই উদ্ঘাটন করা গেছে তখন সেই চুক্তি বাতিল করা হলো না কেন! অন্তর্বর্তী সরকার এসব দুর্নীতি উদ্ঘাটনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন নিশ্চয়ই দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য। কিন্তু সেগুলো বতিল করা হলো না। আমরা জানি যে হঠাৎ করে চুক্তিগুলো বাতিল করা হলে দেশে বিদ্যুতের ভয়াবহ সংকট সৃষ্টি হবে। সেক্ষেত্রে চুক্তিগুলো পুনর্মূল্যায়ন এবং সংশোধনেরও উদ্যোগ নেওয়া যেতো।

 তাও নেওয়া হলো না। উল্টো কষ্টার্জিত বিুপল অংকের বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে তাঁদের বকেয়া পরিশোধ করা হলো। ভবিষ্যতে আরো করতে হবে। ইতিমধ্যে নাকি নতুন করে এত বকেয়া পড়েছে যে সরকারকে আন্তর্জাতিক আদালতের মুখোমুখি হওয়ার শংকা সৃষ্টি হয়েছে।

আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে আদানি : কয়লার মূল্য নির্ধারণ ও বিদ্যুতের দাম নিয়ে বাংলাদেশ বিদ্যুত উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে মিমাংসায় পৌঁছাতে না পারায় ভারতীয় কোম্পানি আদানি পাওয়ার লিমিটেড সিঙ্গাপুরভিত্তিক আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে।বাংলাদেশও বিষয়টি আইনিভাবে মোকাবেলা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এজন্য সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবী এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির (পিজিসিবি) চেয়ারম্যানের সমন্বয়ে একটি প্যানেল গঠন করা হয়েছে। আইনি মোকাবেলার প্রস্ততি হিসেবে ইতিমধ্যে জ্বালানি বিভাগ এবং বিপিডিবি যৌথভাবে কারিগরি ও আইনি দিক নির্ণয়ে বিশেষজ্ঞ নিয়েোগ দিয়েছে বলেও জানা গেছে।

বিপিডিব ও আদানি পাওয়ারের মধ্যে ২৫ বছর মেয়াদি বিদ্যুত কেনা-বেচার চুক্তিটি হয়েছিল ২০১৭ সালের নভেম্বরে। সে অনুযায়ী আদানি ভারতের ঝাড়খন্ড রাজ্যে ১৬০০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতার একটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মান করে। ওই কেন্দ্রের সম্পূর্ণ বিদ্যুতই বাংলাদেশের কাছে বিক্রির জন্য। ২০২৩ সালের এপ্রিল থেকে কেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুত নিতে শুরু করে।

তবে শুরু থেকেই ওই কেন্দ্রে ব্যবহৃত কয়লার দাম নির্ধারণ এবং সরবরাহকৃত বিদ্যুতের দাম নিয়ে বাংলাদেশে সমালোচনা ছিল। অভিযোগ আছে যে আদানি ওই কেন্দ্রের জন্য আমদানি করা কয়লার দাম বেশি ধরছে। ফলে বিদ্যুতের দামও বেশি পড়ছে। এই বাবদ প্রতি বছর আদানি বাংলাদেশের কাছ থেকে ৪০ থেকে ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বেশি বিল নিয়ে নিচ্ছে।

চুক্তি সম্পাদনের সময় ইন্দোনেশিয়ার কয়লার মূল্যকে আদানির ব্যবহৃত কয়লার মূল্যসূচক হিসেবে ধরা হয়েছিল। এক পর্যায়ে ইন্দোনেশিয়ার কয়লার মূল্যে পরিবর্তন হলেও আদানি কোনো পরিবর্তন করেনি। ফলে এক পর্যায়ে আদানি তাঁদের হিসাব অনুযায়ী বিদ্যুতের বিল করলেও বিপিডিবি আলাদা হিসাব করে বিল পরিশোধ করছিল। তাতে আদানির হিসাবে বিপুল পরিমান বকেয়া পড়ে যায়। অবশ্য বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী যে বিল হচ্ছিল সেখান থেকেও বিল বকেয়া পড়েছিল।

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর আদানিসহ অনেকগুলো বিদ্যুতকেন্দ্রের চুক্তিপত্র খতিয়ে দেখার জন্য একটি জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির পর্যালোচনায়ও চুক্তি সম্পাদনে অস্বচ্ছতা এবং দুর্নীতির প্রমান পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়। তবে তারপরও সরকার কোনো চুক্তিই বাতিল করার কোনো উদ্যোগ নেয়নি।


ইতিমধ্যে আদানির হিসাবে বকেয়ার পরিমান বেড়ে যাওয়ায় এবং বিপিডির হিসাবের সঙ্গে তাঁদের হিসাবের পার্থক্য নিয়ে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় কোনো সমঝোতার সম্ভাবনা না থাকায় আদানি আন্তর্জাতিক সালিসি আদালতে গেল।



   


এবিনিউজ টুয়েন্টিফোর বিডিডটকম//এফ//






Advertisement


Advertisement
সর্বশেষ সংবাদ
চট্টগ্রামকে বিলবোর্ডমুক্ত করার ঘোষণা: কাজীর দেউরীতে উচ্ছেদ অভিযানে মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন
গণভোটের ‘হ্যাঁ’—এর জন্য শপথের কোনো প্রয়োজন নেই: পানিসম্পদ মন্ত্রী
সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে কবে, জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
গোপনে মবকে প্রশ্রয় দেওয়া ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হবে: তথ্যমন্ত্রী
গোপনে মবকে প্রশ্রয় দেওয়া ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হবে: তথ্যমন্ত্রী
আরো খবর ⇒
সর্বাধিক পঠিত
ওয়াসায় কক্ষ বরাদ্দ নিয়ে বিভ্রান্তি, সংগঠনের প্রতিবাদ
মহান শহীদ ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস আজ
শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী হচ্ছেন ববি হাজ্জাজ
৫০ সদস্যের মন্ত্রিসভা গঠন করছে বিএনপি, ডাক পেলেন যারা
বিএনপির অবস্থান স্পষ্ট সময় এখন সামনে চলার
সম্পাদক: শাহীন চৌধুরী
উপদেষ্টা সম্পাদক: হেলেনা বিলকিস চৌধুরী, ব্যবস্থাপনা সম্পাদক: সৈয়দ আফজাল বাকের

অফিস: ২/১ হুমায়ুন রোড (কলেজ গেট) মোহাম্মদপুর, ঢাকা-১২০৭ ফোন: ৮৮-০২-৪৮১১৯৪৯৫, হটলাইন: ০১৭১১-৫৮৩৬২৩, ০১৭১৭-০৯৮৪২৮
E-mail : abnews13@gmail.com, Web : www.abnews24bd.com
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, এবিনিউজ